ভোররাতের সেই বিভীষিকা
স্থানীয় সময় সোমবার ভোরে বাগদাদ যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই বিকট বিস্ফোরণের শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, একের পর এক রকেট ভিক্টরি বেস কমপ্লেক্সের ভেতরে আছড়ে পড়তে থাকে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই রকেটগুলো আকাশেই ধ্বংস করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে রকেটগুলো সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। হামলার তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, ঘাঁটির ভেতরে থাকা ইরাকি স্পেশাল ফোর্সের একটি ‘এ৩২০বি’ (A320B) পরিবহন উড়োজাহাজে বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়।
কৌশলগত প্রতীকী আঘাত
যদিও বর্তমানে এই ঘাঁটিতে কোনো মার্কিন সেনা সদস্য স্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন না, তবুও এই হামলাকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রতীকী হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর এলাকার পাশে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি এক সময় ইরাকে মার্কিন আধিপত্যের চূড়ান্ত প্রতীক ছিল। সেখানে সরাসরি আঘাত হানা মানে হলো—মার্কিন প্রতিরক্ষা বলয়ের দুর্বলতাকে বিশ্বমঞ্চে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া।
দ্বিমুখী হামলার ছক: বাগদাদ থেকে ইরবিল
তুরস্কের গণমাধ্যম ‘তুর্কি টুডে’ জানিয়েছে, কেবল রকেট নয়, একটি আত্মঘাতী ড্রোনও এই ভিক্টরি বেস কমপ্লেক্সে আছড়ে পড়েছে। তবে হামলার শিকার কেবল বাগদাদ নয়; প্রায় একই সময়ে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের রাজধানী ইরবিলে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেট লক্ষ্য করেও ড্রোন হামলা চালানো হয়। তবে ইরবিলে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকায় সেখানে ড্রোনগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে সক্ষম হয়। এই দ্বিমুখী হামলা প্রমাণ করে যে, ইরাকের উত্তর থেকে দক্ষিণ—সবখানেই মার্কিন স্থাপনাগুলো এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে।
আরও পড়ুনঃ ইরানি হামলায় ধ্বংস সৌদিতে থাকা মার্কিন ‘উড়ন্ত কন্ট্রোল টাওয়ার’, বিপাকে পেন্টাগন
কেন এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই ধরণের হামলার আশঙ্কা ছিল।
১. প্রতিশোধের রাজনীতি: তেহরানে হামলার পর ইরানপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মার্কিন ঘাঁটিকে নিরাপদ থাকতে দেবে না। গত ২ মার্চ ‘সারায়া আউলিয়া আল-দাম’ নামক গোষ্ঠীটি ড্রোন হামলা শুরু করেছিল, যার ধারাবাহিকতা দেখা গেল আজকের ৩০ মার্চের হামলায়।
২. প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা: বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবে পরিচিত মার্কিন এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কেন বাগদাদে কাজ করল না, তা নিয়ে খোদ পেন্টাগনে তোলপাড় চলছে। এটি মার্কিন প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা নাকি মিলিশিয়াদের উন্নত কৌশলের জয়, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
৩. আঞ্চলিক অস্থিরতা: সংঘাত এখন আর কেবল ইরান বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরাক, সিরিয়া এবং লেবানন এই যুদ্ধের নতুন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ইরাকের ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স’ গোষ্ঠীগুলো এখন তেহরানের হয়ে ছায়াযুদ্ধ (Proxy War) পরিচালনা করছে।
পুরো বাগদাদ জুড়ে উত্তেজনা
হামলার পরপরই পুরো বাগদাদ শহর জুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। রাতভর বাগদাদের আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ড্রোনগুলোকে টহল দিতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এর পাল্টা জবাব হিসেবে ইরাকের ভেতরে কোনো বড় ধরণের বিমান হামলা চালাতে পারে।
ভিক্টরি বেসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ভিক্টরি বেস এক সময় সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে নির্মিত ‘আল-ফাও’ প্রাসাদের পাশে অবস্থিত। মার্কিন আগ্রাসনের সময় এটি তাদের সবচেয়ে সুরক্ষিত দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আজ সেই দুর্গেই রকেট আছড়ে পড়া মানে হলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন শক্তির ক্ষয়িষ্ণু প্রভাবের ইঙ্গিত।
ইরাকের এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে এক নতুন ও জটিল মোড়ে নিয়ে এসেছে। ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যতক্ষণ না তেহরানের ওপর থেকে চাপ কমছে, ততক্ষণ ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন স্বার্থের ওপর আঘাত চলতেই থাকবে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে পেন্টাগনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
সূত্র: আল জাজিরা এবং তুর্কি টুডে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন