অর্থনীতি ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। |
একযোগে ৩ ব্যাংকের অবনমন: বন্ধ হলো মার্জিন ঋণ সুবিধা
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) জানিয়েছে, কেবল ইসলামী ব্যাংকই নয়, ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থতার দায়ে আরও দুটি বেসরকারি ব্যাংকের ক্যাটাগরি নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ব্যাংক দুটি হলো স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড এবং সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক। এই দুটি ব্যাংক আগে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে থাকলেও এখন থেকে তারা ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন করবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার থেকেই এই আদেশ কার্যকর হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে এই তিনটি ব্যাংকের শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা কোনো প্রকার মার্জিন ঋণ সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ, বিনিয়োগকারীদের নিজস্ব অর্থায়নেই এই শেয়ারগুলো কিনতে হবে, যা শেয়ারগুলোর লেনদেনে বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাজারে বড় দরপতন: আতঙ্কে বিনিয়োগকারীরা
ক্যাটাগরি অবনমনের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার দরে বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। বৃহস্পতিবার লেনদেনের শুরুতে ব্যাংকটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৩৪ টাকা ৭০ পয়সা। কিন্তু দুপুর ১২টা বাজতে না বাজতেই শেয়ার দর কমে দাঁড়ায় ৩৩ টাকা ১০ পয়সায়। অর্থাৎ মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বড় অংকের মূলধন হারিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘জেড’ ক্যাটাগরি বা ‘জাঙ্ক’ ক্যাটাগরি মানেই হলো কোনো কোম্পানির আর্থিক দুর্বলতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। কোনো বড় ব্যাংক যখন এই ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন সেই সেক্টরের অন্যান্য কোম্পানির ওপরও নেতিবাচক মানসিক চাপ তৈরি হয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লোকসানের আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন, যা বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থতার নেপথ্যে
পুঁজিবাজারের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি যদি টানা দুই বছর লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হয় অথবা নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM) করতে না পারে, তবে বিএসইসি তাকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করে। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে গত দুই বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে লোকসান বা পর্যাপ্ত মুনাফার অভাব দেখা দেওয়ায় লভ্যাংশ ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। যদিও ব্যাংকটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং তারল্য সংকটের কারণে তারা বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। তবে বিনিয়োগকারীরা এই অজুহাত মেনে নিতে নারাজ। তাদের মতে, সুশাসনের অভাব এবং খেলাপি ঋণের পাহাড়ই ব্যাংকটির এই করুণ দশার মূল কারণ।
বিনিয়োগ ঝুঁকি ও বাজার বিশ্লেষকদের মত
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এই শেয়ারগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। অনেক মিউচুয়াল ফান্ড এবং বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পলিসি অনুযায়ী তারা ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারে না। ফলে বাজারে এই ব্যাংকগুলোর শেয়ারের চাহিদা শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই কঠোর পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য ভালো হলেও স্বল্পমেয়াদে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এটি কোম্পানিগুলোকে একটি কড়া বার্তা দিচ্ছে যে, লভ্যাংশ প্রদানে অবহেলা করলে কোনো ধরণের ছাড় দেওয়া হবে না।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এক সময় দেশের ব্যাংকিং খাতের আইকন ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে ব্যাংকটির মালিকানা পরিবর্তন এবং পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে নানা বিতর্ক আমরা দেখেছি। ‘বিডি নিউজ সত্যকথা’র বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যাংক ‘এ’ ক্যাটাগরি থেকে সরাসরি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামার অর্থ হলো এর অভ্যন্তরীণ আর্থিক কাঠামোর ব্যাপক অবনতি ঘটেছে।
ব্যাংক খাতের এই অস্থিরতা কেবল পুঁজিবাজার নয়, বরং পুরো দেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, যখন আমানতকারীরা দেখেন যে একটি ব্যাংক তার শেয়ারহোল্ডারদেরই মুনাফা দিতে পারছে না, তখন সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। সরকারের উচিত দ্রুত এই ব্যাংকগুলোর প্রকৃত অবস্থা তদন্ত করা এবং প্রয়োজনে বিশেষ তদারকির ব্যবস্থা করা। পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে বিএসইসি’র এই কঠোর অবস্থান প্রশংসনীয়, তবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: বন্ধ কলকারখানা চালুর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন