আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনে মার্কিন নাগরিকদের বিশাল বিক্ষোভ। ছবি: প্রতীকী। |
ভিয়েতনাম ও ইরাক যুদ্ধের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
জরিপটির ফলাফলে একটি ঐতিহাসিক ও উদ্বেগজনক মিল খুঁজে পেয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিনিদের এই নেতিবাচক মনোভাব ২০০৬ সালের ইরাক যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতার সমপর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৬ সালের মে মাসে ইরাক যুদ্ধ চলাকালীন এক জরিপে ৫৯ শতাংশ মার্কিনি সেই যুদ্ধকে ভুল বলেছিলেন। তারও আগে ১৯৭১ সালে গ্যালপ জরিপে দেখা গিয়েছিল, প্রতি ১০ জন মার্কিনির মধ্যে ৬ জনই ভিয়েতনাম যুদ্ধকে ভুল আখ্যা দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, গত ৫০ বছরের ইতিহাসে মার্কিন জনমত যখনই কোনো যুদ্ধের বিরুদ্ধে ৬০ শতাংশের ঘর অতিক্রম করেছে, তখনই সেই সরকারকে চরম রাজনৈতিক সংকটে পড়তে হয়েছে। বর্তমান ইরান যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য তেমনই এক ‘রাজনৈতিক টাইম বোমা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ভোটারদের বিভাজন
জরিপটিতে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে জনমতের এক বিশাল ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে।
ডেমোক্র্যাট: ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই (প্রায় ৯০ শতাংশ) ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের কঠোর বিরোধী।
স্বতন্ত্র ভোটার: যারা কোনো দলের কট্টর সমর্থক নন, সেই স্বতন্ত্র ভোটারদের ৭১ শতাংশই এই যুদ্ধকে ভুল মনে করছেন।
রিপাবলিকান: নিজের দলের প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও ১৯ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থক এই যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল "অপ্রয়োজনীয় বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে না জড়ানো"। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর ইরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তার অনেক সমর্থকের কাছেই ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। ৪৬ শতাংশ উত্তরদাতা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই হামলা ট্রাম্পের আগের নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।
অর্থনৈতিক সংকট ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি
কেন মার্কিনিরা এই যুদ্ধের বিপক্ষে? এই প্রশ্নের উত্তরে জরিপটি এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের পকেটে।
১. জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: প্রায় ৪৪ শতাংশ মার্কিনি জানিয়েছেন, তেলের দাম অস্বাভাবিক বাড়ার কারণে তারা আগের তুলনায় গাড়ি চালানো কমিয়ে দিয়েছেন।
২. জীবনযাত্রার ব্যয়: ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা তাদের দৈনিক খাদ্য ও অন্যান্য খরচ কমাতে বাধ্য হয়েছেন।
৩. নিম্ন আয়ের মানুষ: বিশেষ করে যাদের বার্ষিক আয় ৫০ হাজার ডলারের কম, তাদের অবস্থা শোচনীয়। এই শ্রেণির ৫৯ শতাংশ মানুষ এখন চরম আর্থিক সংকটে ভুগছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার আশ্বাস দিচ্ছেন যে, যুদ্ধ শেষ হলে তেলের দাম কমে যাবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ এখন আর আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার প্রাণহানি মার্কিন জনমতকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে আরও কঠোর করে তুলেছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি। 'বিডি নিউজ সত্যকথা' মনে করে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এই জনমত জরিপ একটি বড় সংকেত। আমেরিকার মানুষ এখন আর 'বিশ্বের পুলিশ' হয়ে অন্য দেশে যুদ্ধ করতে আগ্রহী নয়। তারা তাদের করের টাকা নিজেদের দেশের অর্থনীতি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করতে দেখতে চায়।
অতীতের ভিয়েতনাম যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে খণ্ড-বিখণ্ড করে দিয়েছিল। ইরান যুদ্ধ যদি দ্রুত বন্ধ না হয়, তবে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা বা ক্ষমতার রদবদল ঘটার সম্ভাবনা প্রবল। বিশ্ব দরবারে বন্ধুহীন হওয়া এবং নিজ দেশের জনগণের আস্থা হারানো—উভয় সংকটই এখন ওয়াশিংটনের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি না এলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্বাভাবিক হবে না, আর বাজার স্বাভাবিক না হলে ট্রাম্প প্রশাসনের জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের পথও রুদ্ধ থাকবে।
আরও পড়ুন: পুঁজিবাজারে বড় ধাক্কা: ‘এ’ থেকে সরাসরি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামল ইসলামী ব্যাংকসহ ৩ ব্যাংক
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন