আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
দেড় বছর পর পুরোদমে চালু হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত ভিসা কার্যক্রম। ছবি:প্রতীকী। |
সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ পথ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে এক অভাবনীয় দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ কিছু ইস্যুতে ভুল বোঝাবুঝি চরমে পৌঁছায়। গত বছরের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঢাকায় ভারতীয় মিশনে বিক্ষোভ এবং চট্টগ্রামে সহকারী হাই কমিশনে অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সেই উত্তেজনার রেশ ধরে ২১ ডিসেম্বর থেকে চট্টগ্রামে ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে দিল্লি ও আগরতলা থেকেও কনস্যুলার সেবা স্থগিত করে বাংলাদেশ। এর ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, যারা চিকিৎসা, ব্যবসা বা পর্যটনের প্রয়োজনে নিয়মিত যাতায়াত করেন।
তারেক রহমান-মোদী ফোনালাপ: সম্পর্কের নতুন মোড়
দুই দেশের হিমশীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর। নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক নজিরবিহীন বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি সকালে তিনি ডোনাল্ড তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দেন এবং বিকালেই সরাসরি টেলিফোনে কথা বলেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোদী-তারেক রহমানের সেই ফোনালাপই মূলত দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা কাটানোর প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এরপর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত মাসে দিল্লি সফর করেন, যেখানে তার আলোচনার তালিকার শীর্ষে ছিল ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা। সেই আলোচনার পথ ধরেই এখন ভারত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পুরোদমে ভিসা পরিষেবা চালুর ঘোষণা দিতে যাচ্ছে।
ভিসা কার্যক্রমের বর্তমান চিত্র
বর্তমানে নয়াদিল্লি, কলকাতা, আগরতলা ও চেন্নাইসহ ভারতের সব এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রগুলো সচল রয়েছে। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ জানিয়েছেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকেই তারা পুরোদমে কাজ শুরু করেছেন এবং গত দুই মাসে প্রায় ১৩ হাজারের বেশি ভারতীয় নাগরিককে ভিসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়ী, পর্যটক এবং চিকিৎসার জন্য আসতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা।
অন্যদিকে, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব গ্রহণের পরেই বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলো (IVAC) পূর্ণ গতিতে কাজ শুরু করবে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস উল্লেখ করেছে। এর ফলে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষারত কয়েক হাজার বাংলাদেশি রোগীর দুশ্চিন্তার অবসান হতে যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে আগত বিদেশি পর্যটকদের ২০ শতাংশের বেশি আসে বাংলাদেশ থেকে। ২০২৩ সালে প্রায় ২১ লাখ ২০ হাজার বাংলাদেশি ভারতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভিসা জটিলতায় এই সংখ্যা কমে ১৭ লাখ ৫০ হাজারে নেমে আসে। ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে দুই দেশের পর্যটন খাত যেমন চাঙ্গা হবে, তেমনি সীমান্ত বাণিজ্যও নতুন গতি পাবে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশই ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ দেড় বছর যে ভিসা জটিলতা ছিল, তার খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের। 'বিডি নিউজ সত্যকথা'র বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সাথে একটি সমমর্যাদার সম্পর্ক গড়ার যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তার সুফল পেতে শুরু করেছে জনগণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি নরেন্দ্র মোদীর সমর্থন এবং দ্রুত ভিসা চালুর এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, দিল্লি এখন ঢাকার নতুন নেতৃত্বের সাথে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। তবে ভিসা চালুর পাশাপাশি সীমান্তে হত্যা বন্ধ এবং অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতেও ভারতের ইতিবাচক পদক্ষেপ জরুরি। কেবল ভিসা চালু নয়, দুই দেশের মানুষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধকে 'ভুল' বলছেন ৬১% মার্কিনি: চাপে হোয়াইট হাউস
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন