![]() |
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের পাঠানো ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাবের একটি প্রতীকি চিত্র। |
১৪ দফা প্রস্তাবের পেছনের প্রেক্ষাপট
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা 'তাসনিম নিউজ' জানিয়েছে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ৯ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিল। তেহরান সেই প্রস্তাবটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে তার পাল্টা জবাব হিসেবে নিজেদের ১৪ দফা পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি তেহরানে নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের এক সম্মেলনে বলেন, "আমরা চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের জন্য আমাদের পরিকল্পনা পাকিস্তানের মাধ্যমে জমা দিয়েছি। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কূটনীতির পথে হাঁটবে, নাকি সংঘাত বজায় রাখবে।"
উল্লেখ্য, গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে প্রথম দফার আলোচনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু 'অযৌক্তিক' দাবির মুখে আলোচনা ব্যর্থ হয়। এবারের ১৪ দফা প্রস্তাবকে ইরানের পক্ষ থেকে একটি চূড়ান্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কী আছে ইরানের ১৪ দফা শান্তি পরিকল্পনায়?
রয়টার্স এবং তাসনিম নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের এই নতুন প্রস্তাবে বেশ কিছু কঠোর এবং সুদূরপ্রসারী শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। প্রধান শর্তগুলো হলো:
১. হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা: ভবিষ্যতে ইরান বা ইরানি স্বার্থের ওপর কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালানো হবে না—এই মর্মে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে লিখিত গ্যারান্টি দিতে হবে।
২. মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার: ইরানের সীমান্তবর্তী এলাকা এবং প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে সমস্ত মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সরিয়ে নিতে হবে।
৩. হরমুজ প্রণালি ও নৌ-অবরোধ: ইরানের প্রস্তাবে অন্যতম প্রধান শর্ত হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা।
৪. সম্পদ অবমুক্তি: বিদেশের ব্যাংকে জব্দ করা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনা শর্তে ফেরত দিতে হবে।
৫. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার আলোচনার বিনিময়ে তেহরানের ওপর আরোপিত সমস্ত পশ্চিমা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।
৬. সময়সীমা: যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার জন্য দুই মাসের সময় চেয়েছিল, কিন্তু ইরান তা নাকচ করে দিয়েছে। তেহরানের দাবি, যাবতীয় সমস্যার সমাধান ৩০ দিনের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে।
৭. আঞ্চলিক যুদ্ধ বন্ধ: কেবল ইরান নয়, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সবকটি রণাঙ্গনে চলমান যুদ্ধ ও শত্রুতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে।
ট্রাম্পের সংশয় ও কঠোর অবস্থান
ইরানের এই প্রস্তাবটি বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের টেবিলে রয়েছে। তবে তিনি শুরু থেকেই এটি নিয়ে ইতিবাচক মনে হচ্ছেন না। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, "ইরান আমাদের কাছে যে পরিকল্পনা পাঠিয়েছে তা আমি শিগগিরই পর্যালোচনা করব। তবে এটি গ্রহণযোগ্য হবে বলে আমি কল্পনাও করতে পারছি না।"
ট্রাম্পের মতে, গত ৪৭ বছর ধরে ইরান বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ ক্ষতি করেছে, তার জন্য তারা এখনো পর্যাপ্ত মূল্য পরিশোধ করেনি। এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "তারা একটি চুক্তি করতে চায়, কিন্তু আমি এতে সন্তুষ্ট নই। তারা এমন কিছু দাবি করেছে যাতে আমি একমত হতে পারি না।" ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন হয়তো এই ১৪ দফার অনেকগুলো পয়েন্ট মানতে রাজি হবে না, বিশেষ করে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি।
পরমাণু কর্মসূচি ও পরবর্তী ধাপ
ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, যদি প্রাথমিক শর্তগুলো (হামলা বন্ধ, অবরোধ প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালি খোলা) মানা হয়, তবে পরবর্তী ধাপে ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। জটিল বিষয়গুলো আলোচনার শেষ দিকে রাখা হয়েছে যাতে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের আশঙ্কা, ইরান এই সময়ের সুযোগ নিয়ে তাদের পরমাণু সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে নিতে পারে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
ইরানের ১৪ দফা প্রস্তাবটি আপাতদৃষ্টিতে একটি শান্তি পরিকল্পনা মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমীকরণ পরিবর্তনের এক বিশাল প্রচেষ্টা। 'বিডি নিউজ সত্যকথা'র বিশেষ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইরান এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে দরকষাকষি করছে। হরমুজ প্রণালি—যা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী—সেটি বন্ধ রাখা বা খুলে দেওয়ার বিষয়টি সামনে এনে ইরান সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এটি একটি দ্বিিমুখী সংকট। একদিকে তাঁর ওপর নিজ দেশের জনগণের চাপ রয়েছে যুদ্ধ বন্ধ করে তেলের দাম কমানোর, অন্যদিকে ইসরায়েল ও রিপাবলিকান কট্টরপন্থীদের চাপ রয়েছে ইরানের ওপর আরও কঠোর হওয়ার। ইরান ৩০ দিনের যে সময়সীমা দিয়েছে, তা মূলত ট্রাম্প প্রশাসনকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার একটি কৌশল।
যদি যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবের কিছু অংশ মেনে নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসে, তবে সেটি হবে বর্তমান দশকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। আর যদি ট্রাম্প এটি প্রত্যাখ্যান করেন, তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের লেলিহান শিখা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এই প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর, কারণ তারা উভয় পক্ষের সাথেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
আরও পড়ুন: দেড় বছর পর পুরোদমে চালু হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত ভিসা কার্যক্রম
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন