সত্যকথা রিপোর্ট
![]() |
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে শপথ নিচ্ছেন নবনির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যগণ। পাশে উপস্থিত রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। |
শপথ অনুষ্ঠানের বিস্তারিত চিত্র
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে রাত ৯টায় অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুচারুভাবে সঞ্চালনা করেন। শপথকক্ষে পিনপতন নীরবতার মাঝে স্পিকার যখন শপথবাক্য পাঠ করাচ্ছিলেন, তখন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের দৃপ্ত শপথ ও দেশের সেবায় আত্মনিয়োগের আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে।
শপথ গ্রহণ শেষে নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক সদস্য শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে প্রতিটি সারিতে গিয়ে নবনির্বাচিত সদস্যদের অভিনন্দন জানান। তিনি তাঁদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আপনারা কেবল নারী কোটায় নির্বাচিত হননি, আপনারা এই দেশের জনগণের প্রতিনিধি। গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে এবং ২০২৬-এর বদলে যাওয়া বাংলাদেশের উন্নয়নে আপনাদের মেধা ও শ্রম উৎসর্গ করতে হবে।"
রাজনৈতিক দলভিত্তিক আসন বিন্যাস
গত ৩০ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ৪৯ জন সদস্যের নাম ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করেছিল। রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রাপ্ত সাধারণ আসনের আনুপাতিক হারে এই সংরক্ষিত আসনগুলো বণ্টন করা হয়েছে। এবারের বিন্যাসটি ছিল নিম্নরূপ:
বিএনপি ও তাদের জোট: ৩৬ জন সদস্য।
জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোট: ১২ জন সদস্য।
স্বতন্ত্র জোট: ১ জন সদস্য।
বিএনপি জোটের উল্লেখযোগ্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন সেলিমা রহমান, শিরীন সুলতানা, নিপুণ রায় চৌধুরী এবং হেলেন জেরিন খানের মতো অভিজ্ঞ ও রাজপথের লড়াকু নেত্রীরা। অন্যদিকে জামায়াত জোট থেকে নূরুন্নিসা সিদ্দীকা ও তাসমিয়া প্রধানের মতো পরিচিত মুখগুলো সংসদে স্থান পেয়েছেন।
নুসরাত তাবাসসুম ও আইনি জটিলতা
এবারের সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী নুসরাত তাবাসসুম। জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম থাকলেও নির্ধারিত সময়ের পরে পৌঁছানো এবং আইনি কিছু মারপ্যাঁচে প্রথম দিকে তাঁর মনোনয়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তবে আদালতের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, আইনি প্রক্রিয়া ও আপিলের সময় সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতার কারণে নুসরাত তাবাসসুমের নাম গেজেটে আসতে সামান্য বিলম্ব হচ্ছে। ফলে ৪৯ জন শপথ নিলেও নুসরাত তাবাসসুম রবিবারের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেননি। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে তিনি পরবর্তীতে এককভাবে শপথ নেবেন। এছাড়া জামায়াত জোটের আরেক প্রার্থী মনিরা শারমিনের রিট এখনো আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
উপস্থিত ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও নেতৃবৃন্দ
শপথ অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক অঙ্গনের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কারের এক বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ এক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষে একটি অংশগ্রহণমূলক সংসদের পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়া অত্যন্ত ইতিবাচক।
প্রথমত, বিএনপি ও জামায়াত জোটের এই সম্মিলিত উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বর্তমান সরকার একটি শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ সংসদীয় ব্যবস্থার দিকে হাঁটছে। সংরক্ষিত আসনে রাজপথের সক্রিয় নেত্রীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে আগামীতে সংসদীয় বিতর্কে নারীর অংশগ্রহণ ও তাত্ত্বিক লড়াই আরও জোরালো হবে।
দ্বিতীয়ত, নুসরাত তাবাসসুম বা নব্য রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী তরুণীদের সংসদে আসার সুযোগ পাওয়াটি 'জেন-জি' বা তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশার প্রতিফলন। যদিও আইনি কারণে নুসরাত রবিবারে শপথ নিতে পারেননি, তবে তাঁর মনোনয়ন বৈধ হওয়া এটিই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ ও আইনানুগ।
তৃতীয়ত, স্বতন্ত্র জোট থেকে ১ জনের অংশগ্রহণ এবং জামায়াতের ১২ জন সদস্যের উপস্থিতি সংসদে মতপ্রকাশের বৈচিত্র্য বজায় রাখবে। বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, এই সংরক্ষিত আসনের সাংসদরা যদি কেবল দলীয় এজেন্ডা নয়, বরং প্রান্তিক নারীদের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে সরব হন, তবেই এই নির্বাচনের প্রকৃত সার্থকতা আসবে।
আরও পড়ুন: ইরানের ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব বনাম ট্রাম্পের অনড় অবস্থান
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন