সত্যকথা রিপোর্ট
আজ সকাল থেকেই ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নজিরবিহীনভাবে জোরদার করা হয়। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রথমে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আসামি স্বপ্না আক্তারকে আদালতে আনা হয়। এর ঠিক ২০ মিনিট পর, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কড়া পুলিশি পাহারায় প্রিজনভ্যানে করে নিয়ে আসা হয় প্রধান অভিযুক্ত নরপশু সোহেল রানাকে। আদালত প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। রায় ঘোষণার আগে দুজনকে এজলাসে তোলা হলে পুরো আদালতকক্ষে এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। বেলা ১১টার পর বিজ্ঞ বিচারক জনাকীর্ণ আদালতে এই মামলার রায় পড়া শুরু করেন। আদালত তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টে হত্যার পূর্বে শিশুটিকে পাশবিক উপায়ে ধর্ষণের অকাট্য আলামত মিলেছে এবং আসামি সোহেল রানা স্বেচ্ছায় যে জবানবন্দি দিয়েছিল, তা প্রত্যাহারের কোনো আবেদন না থাকায় প্রমাণিত হয় সে নিজের ইচ্ছায় অপরাধ স্বীকার করেছে। একই সাথে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার স্বামীকে পালাতে ও লাশ গুম করতে সরাসরি সহযোগিতা করায় সমঅপরাধে অপরাধী।
১৯ দিনের রেকর্ড সময়ে বিচার: দেশের ইতিহাসে অনন্য এক নজির
গত ১৯ মে পল্লবীর পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছোট্ট রামিসা আক্তারকে তাদের প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া সোহেল ও স্বপ্নার ফ্ল্যাটের ভেতর পাশবিক নির্যাতন ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছিল। এই পৈশাচিক ঘটনার পর ভুক্তভোগীর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। ঘটনার ভয়াবহতা এবং জনমনে তীব্র ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনা করে রাষ্ট্রপক্ষ ও আদালতের অভাবনীয় তৎপরতায় মাত্র ১৯ দিনের রেকর্ড সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল থেকে শুরু করে আজ চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হলো। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এত দ্রুততম সময়ে কোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
নথি অনুযায়ী, ২০ মে মামলা দায়েরের মাত্র ৫ দিনের মাথায় (২৪ মে) তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীন সরকারি ছুটি ও ঈদুল আজহার ছুটি বাতিল করে বিশেষ ব্যবস্থায় মামলাটির দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করেন। গত ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর ২ জুন মাত্র এক কার্যদিবসে চার্জশিটভুক্ত ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন করা হয়। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনে সোহেল রানা নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, যদিও তার স্ত্রী স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিল। ৪ জুন উভয় পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আজ ৭ জুন রায়ের দিন ধার্য করা হয়। মাত্র ৪ কার্যদিবসের ট্রায়ালে এই বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের রোমহর্ষক বিবরণ: কেঁদেছেন আইনজীবীরাও
আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানির সময় একের পর এক সাক্ষীর মুখে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বিবরণ শুনে পুরো আদালতকক্ষে এক স্তব্ধ ও শোকাবহ পরিবেশের তৈরি হয়। উপস্থিত অনেক আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ডুকরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আদালতে রামিসার সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা এসআই মো. ইকবাল হোসেন কান্নাভেজা কণ্ঠে জানান, ঘটনাস্থলে আসামিদের শয়নকক্ষের দরজার সামনে খাটের নিচে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রামিসার দেহ পড়ে ছিল এবং ঘরের এক কোণায় রক্তমাখা একটি পানির বালতির ভেতর থেকে তার কাটা মাথাটি উদ্ধার করা হয়। লাশ চিরতরে গুম করার উদ্দেশ্যে নরপশুরা শিশুটির হাত-পা আলাদা করার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার যৌনাঙ্গও ক্ষতবিক্ষত করে। একটি জর্জেটের ওড়না দিয়ে শিশুটির মুখ শক্ত করে বেঁধে এই পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাসাদ জাবিন তার ময়নাতদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করেন, মূলত অত্যন্ত ধারালো অস্ত্র বা ছুরি দিয়ে গলা কেটে মাথা বিচ্ছিন্ন করার কারণেই রামিসার তাৎক্ষণিক মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পূর্বে তাকে তীব্রভাবে শারীরিক ও পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছিল। মামলার মূল তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান জানান, ঘটনার পর রামিসার মা পারভীন আক্তার প্রতিবেশীদের নিয়ে ওই ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে 'বোন দরজাটা খুলে দে, তোর কিছু হবে না' বলে বারবার আকুতি জানালেও ঘরের ভেতর থেকে খুনি দম্পতি দরজা খোলেনি। কারণ, তারা তখন ভেতরে বাথরুমে শিশুটিকে নিস্তেজ করার পর লাশ গুম ও মাথা কাটার খেলায় লিপ্ত ছিল। এমনকি গ্রেপ্তারের আগ মুহূর্তে তারা রক্তাক্ত ঘরের গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত আলামত পানি দিয়ে ধুয়ে নষ্ট করার চেষ্টা চালিয়েছিল।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যার এই ঐতিহাসিক রায় বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণত আমাদের দেশে একটি গুরুতর ফৌজদারি মামলার তদন্ত, চার্জশিট ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে বছরের পর বছর, এমনকি এক দশকও পার হয়ে যায়। সেই আমলাতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘসূত্রতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাত্র ১৯ দিনের মাথায় তদন্ত থেকে রায় ঘোষণা—নিঃসন্দেহে দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি সোনালী নজির এবং এক নজিরবিহীন আইনি মাইলফলক। এর জন্য ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীন, দ্রুততম সময়ে চার্জশিট দেওয়া তদন্ত কর্মকর্তা এবং ছুটি বাতিল করে দিনরাত কাজ করা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বিশেষ ধন্যবাদের পাত্র।
এই রায় প্রমাণ করে, সদিচ্ছা থাকলে এবং রাষ্ট্র ও প্রশাসন যদি আন্তরিক হয়, তবে যেকোনো অপরাধের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার সম্ভব। তবে বিডি নিউজ সত্যকথা এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উচ্চ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। বিচারিক আদালতে রায় দ্রুত হলেও, উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স (Death Reference) এবং আসামিদের আপিল শুনানির স্তরে গিয়ে মামলাগুলো আবার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফাঁসির রায় কার্যকর হতে বছরের পর বছর দেরি হলে রায়ের মূল উদ্দেশ্য ও অপরাধীদের মনে ভয়ের যে বার্তা পৌঁছানোর কথা, তা অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। তাই আমরা রাষ্ট্রপক্ষ এবং মাননীয় প্রধান বিচারপতির কাছে জোর দাবি জানাই, এই বিশেষ মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে উচ্চ আদালতেও যেন একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দ্রুততম সময়ে ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষ করা হয়। যাতে খুনি সোহেল ও স্বপ্নার ফাঁসি দ্রুত কার্যকর করা যায়। এই নরপশুদের দ্রুত ফাঁসি কার্যকর হলেই কেবল ওপারে থাকা শিশু রামিসার আত্মা শান্তি পাবে এবং সমাজ থেকে এই ধরনের পৈশাচিক মানসিকতার অপরাধীদের কাছে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছাবে।
আরও পড়ুন: বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচকে আরও এক ধাপ পিছলো বাংলাদেশ, অবস্থান এখন ৯৬তম
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন