হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এক ধাপ নিচে নেমে গেলেও একটি জায়গায় স্বস্তি রয়েছে। বর্তমান তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশের সাধারণ পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের মোট ৩৬টি দেশে কোনো ধরনের আগাম বা পূর্ববর্তী ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের আইনি সুবিধা পাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে এই দেশগুলো বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে রেখেছে, যা বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই ৩৬টি দেশে ভ্রমণের নিয়ম ও প্রক্রিয়া সব ক্ষেত্রে এক নয়। সূচকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণের নিয়মগুলোকে প্রধানত তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে:
১. সম্পূর্ণ ভিসামুক্ত প্রবেশ (Visa-Free): যেখানে শুধুমাত্র বৈধ পাসপোর্ট নিয়ে গেলেই সরাসরি প্রবেশাধিকার পাওয়া যায়।
২. অন-অ্যারাইভাল ভিসা (Visa on Arrival): যে দেশগুলোতে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর বা স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টার থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ভিসা সংগ্রহ করতে হয়।
৩. ই-ভিসা (e-Visa): কিছু দেশের ক্ষেত্রে ভ্রমণের পূর্বে অনলাইনে আবেদন করে একটি ইলেকট্রনিক ভিসা বা অনুমতিপত্র সংগ্রহ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
যেসব দেশ ও দ্বীপ রাষ্ট্রে যেতে পারবেন বাংলাদেশিরা
হেনলি পাসপোর্ট সূচকে ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা পাওয়া দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা, ওশেনিয়া এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বেশ কিছু আকর্ষণীয় দেশ ও দ্বীপ রাষ্ট্র। উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ভুটান, কম্বোডিয়া, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা: এশিয়ার এই প্রতিবেশী ও জনপ্রিয় পর্যটন দেশগুলো বাংলাদেশিদের অন-অ্যারাইভাল বা ই-ভিসা সুবিধা দিয়ে থাকে।
কেনিয়া, সেশেলস, জিবুতি ও মাদাগাস্কার: আফ্রিকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এই দেশগুলোতে রয়েছে বিশেষ প্রবেশাধিকার।
বার্বাডোজ, বাহামাস, জ্যামাইকা, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো, ডমিনিকা, গ্রেনাডা ও হাইতি: ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের এই বিখ্যাত দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো মূলত সম্পূর্ণ ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা দেয়।
ফিজি, ভানুয়াতু ও সামোয়া: ওশেনিয়া মহাদেশের এই প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতেও বাংলাদেশিরা আগাম ভিসা ছাড়া যেতে পারেন।
শীর্ষে সিঙ্গাপুর, এশিয়া ও ইউরোপের জয়জয়কার
২০২৬ সালের মে মাসের এই বৈশ্বিক পাসপোর্ট শক্তির তালিকায় এককভাবে বিশ্বের শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপ রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই আগাম ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন, যা তাদের পাসপোর্টকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী পাসপোর্টে পরিণত করেছে।
সূচকে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে এশিয়ার আরও দুই উন্নত দেশ—জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাসপোর্টের শক্তি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও মুক্ত বাণিজ্য নীতির কারণে অভূতপূর্ব গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।
শক্তিশালী পাসপোর্টের দিক থেকে এককভাবে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে ইউরোপের দেশ সুইডেন। অন্যদিকে চতুর্থ স্থানে যৌথভাবে অবস্থান করছে ইউরোপের একঝাঁক ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র। এই তালিকায় রয়েছে—বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন এবং সুইজারল্যান্ড। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত চলাচল নীতি এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে এই দেশগুলোর পাসপোর্টধারীরা প্রায় পুরো বিশ্বেই অবাধে যাতায়াত করতে পারেন।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের ৯৫তম থেকে ৯৬তম স্থানে নেমে যাওয়াটা আমাদের আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম সতর্কবার্তা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় আমাদের পাসপোর্টের মান উন্নত করার যে তাগিদ দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিবিদ ও ভূ-রাজনীতিবিদরা দিয়ে আসছেন, তা এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, অথচ আমাদের পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
ভিসামুক্ত ভ্রমণের জন্য যে ৩৬টি দেশের তালিকা দেওয়া হয়েছে, তার সিংহভাগই ছোট ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশ। উন্নত বা প্রথম বিশ্বের কোনো দেশই এখনো বাংলাদেশিদের জন্য অন-অ্যারাইভাল বা ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়নি। এর প্রধান কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা মনে করেন—অবৈধ অভিবাসনের প্রবণতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অভাব এবং দেশের ভেতরে পাসপোর্টের নিরাপত্তা যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার কিছু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার যেভাবে ফ্রিল্যান্সিং খাত বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বৈপ্লবিক উন্নয়নে জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে এবং তরুণদের বৈশ্বিক আয়ের কর মওকুফ করেছে, ঠিক একইভাবে আমাদের পাসপোর্টকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদাপূর্ণ করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। শুধু দক্ষিণ এশিয়া বা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ল্যাটিন আমেরিকা এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সাথে শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্থাপন করতে হবে। আমাদের ইমিগ্রেশন সিস্টেমকে শতভাগ জালিয়াতিমুক্ত এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা সময়ের দাবি। পাসপোর্ট শক্তিশালী হলে শুধু পর্যটনই সহজ হয় না, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবসা, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং মেধা বিকাশের পথও বহুগুণ সুগম হয়।
আরও পড়ুন: ফ্রিল্যান্সারদের ৭.৫% উৎসে কর প্রত্যাহার, কেটে নেওয়া টাকা ফেরত দিচ্ছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন