অর্থনীতি ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের ফ্রিল্যান্সার, ফ্রিল্যান্সিং অ্যাসোসিয়েশন এবং ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও হতাশা বিরাজ করছিল। বিভিন্ন ব্যাংক ফ্রিল্যান্সারদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক রেমিট্যান্স বা আয়ের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তন শুরু করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। তরুণ ফ্রিল্যান্সারদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, যেখানে সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট ইকোনমি গড়ে তোলার কথা বলছে, সেখানে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো একটি সম্ভাবনাময় স্বনির্ভর খাতের আয়ের ওপর এমন কর আরোপ তরুণদের এই পেশার প্রতি নিরুৎসাহিত করবে এবং হুন্ডির মতো অবৈধ পথে টাকা আনার প্রবণতা বাড়িয়ে দেবে।
বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে নজরে আসার পর দেশের ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ের ওপর এই প্রস্তাবিত কর আরোপ না করার দ্রুত ও সরাসরি আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১ জুন সচিবালয়ে দেশের জনপ্রিয় ফেসবুক পেজ ‘চিত্ত মিডিয়া’র প্রতিষ্ঠাতা ও তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর জুয়েল রানার সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেই বৈঠকে তরুণদের এই সংকটের কথা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়।
বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ বক্তব্যে জুয়েল রানা জানান, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর ৭.৫ শতাংশ কর আরোপের ফলে মাঠপর্যায়ে যে বিভ্রান্তি ও হতাশা তৈরি হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে তরুণদের এই সমস্যার কথা শোনেন এবং তৎক্ষণাৎ সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, দেশের তরুণ সমাজকে স্বাবলম্বী করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ফ্রিল্যান্সারদের অবদানকে বাধাগ্রস্ত করে এমন কোনো কর আরোপ করা সমীচীন হবে না। প্রধানমন্ত্রীর এই ইতিবাচক অবস্থানের পরই দ্রুত গতিতে কর প্রত্যাহারের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ঐতিহাসিক ঘোষণা ও টাকা ফেরতের উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী নির্দেশনার পরপরই দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে ডাচ-বাংলা ব্যাংক। শুক্রবার (৫ জুন) ডাচ-বাংলা ব্যাংকের অফিসিয়াল ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর উৎসে কর কর্তন বন্ধের এই ঐতিহাসিক তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে বিডি নিউজ সত্যকথার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের জনসংযোগ কর্মকর্তা সগীর আহমেদ জানান, আইটি ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের ওপর সরকারের পূর্ববর্তী কর নীতিমালা এবং ব্যাংকিং নিয়মের জটিলতার কারণে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী সাড়ে ৭ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হচ্ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি, দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দ্রুত বিকাশ এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ে তরুণদের আরও বেশি উৎসাহিত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনার আলোকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে কর কাটা বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু করেছে।
তিনি আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক তথ্য শেয়ার করে বলেন, "আমাদের ব্যাংক শুধু কর কাটাই বন্ধ করেনি, বরং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং ফ্রিল্যান্সারদের অধিকার রক্ষায় একটি বিশেষ কার্যনির্বাহী দল গঠন করেছে। বিগত কয়েক দিনে যেসব ফ্রিল্যান্সারের অ্যাকাউন্ট থেকে ইতোমধ্যে নিয়ম অনুযায়ী করের টাকা কেটে নেওয়া হয়ে গেছে, সেই অর্থ কীভাবে কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের অ্যাকাউন্টে দ্রুততম সময়ে রিফান্ড বা ফেরত দেওয়া যায়, আমরা সেই টেকনিক্যাল কার্যক্রম শুরু করেছি। আশা করছি খুব দ্রুতই ফ্রিল্যান্সাররা তাদের কেটে নেওয়া অর্থ ফেরত পেয়ে যাবেন।"
খাত সংশ্লিষ্ট বড় বড় আইটি বিশেষজ্ঞ এবং ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটির লিডাররা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী নির্দেশনা এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মতো শীর্ষ ব্যাংকের এমন দ্রুত ও দায়িত্বশীল উদ্যোগের ফলে দেশের আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং খাত আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। এটি ফ্রিল্যান্সারদের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে টাকা আনার ক্ষেত্রে আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, দেশের ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ের ওপর থেকে ৭.৫% উৎসে কর প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ইতিহাসে একটি অন্যতম সেরা ও যুগান্তকারী মাইলফলক। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে ফ্রিল্যান্সিংয়ের বাজারে অন্যতম শীর্ষ সরবরাহকারী দেশ। লাখ লাখ তরুণ কোনো সরকারি কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভর না করে, সম্পূর্ণ নিজস্ব মেধা ও শ্রমে ঘরে বসে বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে নিয়ে আসছেন। এমন একটি স্বাবলম্বী ও উদীয়মান খাতকে করের বেড়াজালে আবদ্ধ করা হতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেভাবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বাইরে গিয়ে একজন সাধারণ কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সাথে সরাসরি বৈঠক করে তরুণদের মনের ভাষা বুঝতে পেরেছেন এবং তৎক্ষণাৎ কর প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এটি প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকার তরুণদের কর্মসংস্থান এবং আইটি খাতকে কতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তবে বিডি নিউজ সত্যকথা এখানে একটি জরুরি বিষয়ে ব্যাংকিং খাতের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। ডাচ-বাংলা ব্যাংক যেভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কেটে নেওয়া টাকা ফেরতের ঘোষণা দিয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং অন্য সকল ব্যাংকের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। কিন্তু দেশের আরও বেশ কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক এখনো ফ্রিল্যান্সারদের রেমিট্যান্সের ওপর বিভিন্ন ছদ্ম নামে চার্জ কাটা বা রেমিট্যান্সের টাকা অ্যাকাউন্টে জমা করতে আমলাতান্ত্রিক নথিপত্র চেয়ে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত এখনই একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর সার্কুলার জারি করে দেশের প্রতিটি ব্যাংকে ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর যেকোনো ধরনের লুকানো চার্জ বা কর কাটার পথ চিরতরে বন্ধ করা। একই সাথে ফ্রিল্যান্সারদের অর্জিত আয়ের ওপর যেন ডলারের সঠিক রেট দেওয়া হয়, তাও নিশ্চিত করতে হবে। তবেই দেশ থেকে মেধা পাচার বা 'ব্রেন ড্রেন' বন্ধ হবে এবং তরুণরা বৈধ চ্যানেলে শতভাগ রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত হবে।
আরও পড়ুন: জ্যৈষ্ঠের কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা গরমে পুড়ছে দেশ, ৪৯ জেলায় দাবদাহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন