আবহাওয়া অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী, গতকাল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে উত্তরের জেলা দিনাজপুরে, যা ছিল ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে মেগা সিটি রাজধানী ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যদিও খাতাকলমে এই তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘর স্পর্শ করেনি, তবুও বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্পের উপস্থিতির কারণে অনুভূত তাপমাত্রা (Feel Like Temperature) ৪২ থেকে ৪৩ ডিগ্রির মতো মনে হচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালেও সূর্য ওঠার পর থেকেই চারপাশ তপ্ত হতে শুরু করেছে। সকাল ৬টায় রাজধানীর তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনভর এই তীব্র গরম ও আর্দ্রতার কারণে নাগরিক জীবনে চরম অস্বস্তি বজায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার পাশাপাশি রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে এবং আপাতত এই পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।
বিকেলের বৃষ্টিতে কিছুটা স্বস্তির আভাস, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত
এই দুঃসহ গরমের মধ্যেই কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আজ বৃহস্পতিবার দেশের কিছু কিছু অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী—রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে পশ্চিম অথবা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। বজ্রবৃষ্টি ও ঝড়ের এই আশঙ্কার কারণে এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। যদিও বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে রাজধানীতে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তা সামগ্রিক তাপদাহ থেকে দীর্ঘমেয়াদি কোনো স্বস্তি দিতে পারবে না। বৃষ্টির কারণে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমলেও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্ষা বা মৌসুমি বায়ু পুরোপুরি সক্রিয় না হওয়া পর্যন্ত দেশের বড় অংশেই এই ভ্যাপসা ও গরম আবহাওয়া অব্যাহত থাকবে।
হিটস্ট্রোকের চরম ঝুঁকি: সতর্কবার্তা দিলো ‘বাংলাদেশ ওয়েদার অবজার্ভেশন টিম’
তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির নিচে থাকলেও বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে শরীর ঠিকমতো ঘামাতে পারে না, যার ফলে অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে গিয়ে ‘হিটস্ট্রোক’-এর মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিকে সামনে রেখে দেশের বেসরকারি আবহাওয়া পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘বাংলাদেশ ওয়েদার অবজার্ভেশন টিম লিমিটেড’ (BWOT) জনসাধারণের উদ্দেশ্যে জরুরি সতর্কবার্তা ও করণীয় নির্দেশ করেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশজুড়ে চলমান তাপপ্রবাহ এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণের কারণে এক অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই সময়ে সামান্য অসতর্কতায় যে কেউ হিটস্ট্রোকের শিকার হতে পারেন। এই মরণঘাতী ঝুঁকি এড়াতে তারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে:
রোদের তীব্রতা এড়িয়ে চলা: বিশেষ করে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত, যখন রোদের তেজ সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন সরাসরি কড়া রোদের মধ্যে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এই সময়ে ঘরের বাইরে না যাওয়াই উত্তম।
মাথা ও শরীর ঢাকা: জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হলে অবশ্যই ছাতা, টুপি বা সুতি কাপড় দিয়ে মাথা ও মুখ ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
পর্যাপ্ত তরল খাবার গ্রহণ: অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বের হয়ে যায়, যা দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি করে। তাই তৃষ্ণা না পেলেও ঘন ঘন নিরাপদ পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি বা লেবুর শরবত পান করতে হবে।
ভারী পরিশ্রম পরিহার: এই তীব্র গরমে খোলা মাঠে দীর্ঘ সময় ধরে কৃষিকাজ, রিকশা চালানো বা যেকোনো ধরনের কঠোর শারীরিক পরিশ্রমমূলক কাজ করা হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই কাজের ফাঁকে ফাঁকে ছায়াযুক্ত স্থানে বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এখন আমাদের দোরগোড়ায়। জ্যৈষ্ঠ মাসে গরম পড়াটা স্বাভাবিক হলেও, মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুন পর্যন্ত একটানা এই ভ্যাপসা গরম ও আর্দ্রতার এমন ভারসাম্যহীন আচরণ মোটেও স্বাভাবিক নয়। এটি আমাদের পরিবেশগত বিপন্নতারই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
সরকারিভাবে আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাস দিলেও, মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগ বা স্থানীয় প্রশাসনের তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশাচালক এবং খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকদের হিটস্ট্রোক সম্পর্কে সচেতন করা এবং প্রতিটি মোড়ে বা জনবহুল এলাকায় বিনামূল্যে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
কাগজে-কলমে বৃষ্টি বা কালবৈশাখীর পূর্বাভাস থাকলেও, তা কেবল সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে; প্রকৃতি শীতল হওয়ার আগেই আবারও তপ্ত হয়ে উঠছে বাতাস। এই পরিস্থিতিতে কেবল আবহাওয়া বার্তার দিকে তাকিয়ে না থেকে সাধারণ নাগরিকদের নিজেদের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সচেতন হতে হবে। বাইরে বের হওয়ার সময় ছাতা ও পানির বোতল সাথে রাখা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং জীবন বাঁচানোর অনুসঙ্গ। একই সাথে নগরায়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা এবং জলাশয় ভরাট বন্ধ না করলে, আগামী দিনগুলোতে এই তাপদাহ আরও কতটা ভয়ংকর রূপ নেবে, তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়।
আরও পড়ুন: কক্ষপথে ২৭ বছর: আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে বিপজ্জনক 'বাতাস লিক', চরম ঝুঁকিতে নভোচারীরা
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন