দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে নিরলসভাবে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) এখন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুতর সংকটের মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্ট-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম বড় এই নিরাপত্তা উদ্বেগের তথ্য জনসমক্ষে আনা হয়েছে। স্টেশনটির রুশ অংশে ক্রমাগত ‘বাতাস লিক’ বা ছিদ্র দিয়ে বায়ুমণ্ডল মহাশূন্যে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা বিজ্ঞানীদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের ‘বিপর্যয়’ ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই বিপজ্জনক লিকটি মহাকাশ স্টেশনটির রুশ অংশের ‘পিআরকে’ (PRK) মডিউল নামক একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ স্থানান্তর টানেলে অবস্থিত। এই টানেলটি মূলত প্রগ্রেস কার্গো শিপ আনলোড করার জন্য ব্যবহৃত হয়। নাসার মুখপাত্র জশ ফিঞ্চ জানান, মহাকাশ স্টেশনের ভেতরের এই আণুবীক্ষণিক কাঠামোগত ফাটল দিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক পাউন্ড করে বাতাস মহাশূন্যে হারিয়ে যাচ্ছে।
যদিও এই লিক বর্তমানে মহাকাশ স্টেশনের নিয়মিত কার্যক্রম বা সেখানে থাকা সাতজন নভোচারীর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার ওপর কোনো প্রভাব ফেলছে না, তবুও সংস্থার অভ্যন্তরীণ বৈঠকে এই ত্রুটি যেকোনো সময় একটি ‘বিপর্যয়কর ব্যর্থতা’ ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সর্বোচ্চ ঝুঁকি: ৫×৫ রিস্ক ম্যাট্রিক্স
মহাকাশ বিজ্ঞান বিষয়ক সংবাদমাধ্যম আর্স টেকনিকার তথ্য অনুযায়ী, নাসা মহাকাশ অভিযানের ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে একটি বিশেষ ৫×৫ ‘রিস্ক ম্যাট্রিক্স’ ব্যবহার করে। এই ম্যাট্রিক্সে কোনো ত্রুটির ‘ঘটার সম্ভাবনা’ এবং ‘প্রভাব’—উভয় দিক বিবেচনা করে নম্বর দেওয়া হয়।
উদ্বেগের বিষয় হলো, নাসার প্রকৌশলীরা রুশ মডিউলের এই লিকটিকে উচ্চ সম্ভাবনা এবং উচ্চ প্রভাব—উভয় ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ ‘৫’ নম্বর ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। এর অর্থ হলো, এই ত্রুটি যেকোনো সময় মহাকাশ স্টেশনের কাঠামোকে অচল করে দিতে পারে এবং এর প্রভাব হবে চরম।
জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা ও ২০৩০-এর ভবিষ্যৎ
পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে নভোচারীদের জরুরি ভিত্তিতে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার মতো বিশেষ উদ্ধার পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নাসা জানিয়েছে, প্রকৌশলীরা সিল্যান্ট এবং একাধিক পরিদর্শন চালিয়ে লিকটি একটি ‘স্থিতিশীল অবস্থায়’ রাখার চেষ্টা করছেন, তবে মে মাসে নতুন করে বাতাসের চাপ কমে যাওয়ার ঘটনা তাদের আবার সতর্ক করে দিয়েছে।
১৯৯৮ সালে রাশিয়ার জারিয়া মডিউল পাঠানোর মাধ্যমে এই স্টেশন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। মানুষের তৈরি সর্ববৃহৎ এই স্থাপনাটি ২০৩০ সালে অবসরে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। নিউ ইয়র্ক পোস্ট-এর প্রতিবেদনে প্রাক্তন নাসার বাণিজ্যিক মহাকাশ উড্ডয়নের পরিচালক ফিল ম্যাকঅ্যালিস্টার বলেন, এই ঘটনাটি ২০৩০ সালের মধ্যেই আইএসএস-কে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে আরও আধুনিক ও সাশ্রয়ী বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম দিয়ে প্রতিস্থাপন করার সিদ্ধান্তকে আরও বেশি যুক্তিযুক্ত করে তুলেছে। তবে মার্কিন কংগ্রেস এটিকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত সচল রাখার কথা ভাবছিল। এই নতুন ত্রুটি এখন সেই পরিকল্পনার সামনেও বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে এই ‘বাতাস লিক’ কেবল একটি কারিগরি ত্রুটি নয়, বরং এটি মহাকাশে মানুষের তৈরি কাঠামোর বার্ধক্যের এক বড় সংকেত। ২৭ বছর কক্ষপথে থেকে এটি শত শত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে, কিন্তু এখন এর নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও নাসা ও রসকসমসের যৌথ প্রচেষ্টা এবং সমস্যাটিকে সর্বোচ্চ ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ওটিটি, সোশ্যাল মিডিয়া এবং আধুনিক বিনোদন মাধ্যমে মহাকাশ অভিযানের গ্ল্যামার যতটা তুলে ধরা হয়, মাঠপর্যায়ের বাস্তব ঝুঁকি ততটাই ভয়াবহ হতে পারে। এই ঘটনাটি ২০৪০ সালের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার মতো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব নিয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। একটি সুস্থ, কর্মক্ষম এবং বিজ্ঞানমনস্ক বিশ্ব গড়তে হলে যেমন তামাকের প্রলোভন রুখতে হয়, তেমনই মহাকাশে সুশাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
আরও পড়ুন: ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে তামাকের প্রলোভন ও আসক্তি রুখতেই হবে: প্রধানমন্ত্রী
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন