![]() |
| তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ: প্রধানমন্ত্রী। |
৮৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি ও বার্ষিক ২ লাখ মৃত্যু: এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে তামাকের কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর নেমে আসা এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) অফিসিয়াল তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটে নানা ধরনের অসংক্রামক রোগের কারণে। আর এই অসংক্রামক রোগগুলোর পেছনে অন্যতম প্রধান ও বড় ঝুঁকির কারণ হচ্ছে তামাক ও নিকোটিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।
তিনি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘টোব্যাকো এটলাস ২০২৫’-এর রিপোর্টের তথ্য উল্লেখ করে জানান, বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার (প্রায় দুই লাখ) মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করে। তামাক কেবল মানুষের জীবনই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকেও পঙ্গু করে দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, তামাক ব্যবহারের ফলে জনগণের অতিরিক্ত চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য ব্যয়, পরিবেশগত মারাত্মক ক্ষতি এবং মানুষের অকাল মৃত্যুতে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি! এই বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক ক্ষতি একটি উন্নয়নশীল দেশের অগ্রযাত্রার জন্য বড় অন্তরায়।
ওটিটি, সিনেমা ও সোশ্যালে তামাকের বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
বিড়ি, সিগারেট, জর্দা ও গুলের পাশাপাশি বর্তমান যুগে তরুণ প্রজন্মকে ব্যাপকভাবে আকর্ষণ করছে আধুনিক ‘ই-সিগারেট’ বা ‘ভেপিং’ এবং বিভিন্ন নিকোটিনযুক্ত পণ্য। প্রধানমন্ত্রী কঠোরভাবে মনে করিয়ে দেন যে, তামাকে বিদ্যমান নিকোটিন অত্যন্ত মারাত্মক আসক্তি সৃষ্টি করে, যা পরবর্তী সময়ে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির জন্ম দেয়।
তরুণ ও শিশু-কিশোরদের এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচাতে সরকার সব ধরনের প্রচারণার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, "তামাকের প্রলোভন থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় তামাকজাত দ্রব্যের সব ধরনের বিজ্ঞাপন, সরাসরি প্রচারণা ও প্রমোশন আইনত নিষিদ্ধ।"
তিনি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে জানান যে, প্রথাগত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি এখন ইন্টারনেট, ফেসবুক-ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপস, ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম, নাটক, সিনেমা কিংবা যেকোনো বিনোদন মাধ্যমে তামাকের দৃশ্য বা পরোক্ষ প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি তামাক কোম্পানিগুলো যাতে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা ‘সিএসআর’ (CSR) কার্যক্রমের আড়ালে ছদ্মবেশে নিজেদের ব্র্যান্ডের প্রচার করতে না পারে, আইন সংশোধন করে তাও সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়েছে।
স্কুল-হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে দোকান নয়, ১৮-র নিচে বিক্রি দণ্ডনীয়
জনস্বাস্থ্যের শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা), হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান এবং শিশু পার্কের সীমানার ১০০ মিটারের মধ্যে কোনো ধরনের তামাক বা তামাকজাত পণ্য বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
একই সাথে তিনি মনে করিয়ে দেন, ১৮ বছরের নিচে কোনো নাবালক বা কিশোরের কাছে তামাক ও নিকোটিন পণ্য বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। নতুন প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পাবলিক প্লেস ও সব ধরনের গণপরিবহনে ধূমপান এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক (যেমন জর্দা-গুল) সেবনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। আইনের এই ধারাগুলো যাতে কেউ অমান্য করতে না পারে, সেজন্য অপরাধের শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণও আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
আইনি ধারাবাহিকতা ও সুশাসনের অঙ্গীকার
বাংলাদেশ যে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিশ্বমঞ্চে শুরু থেকেই অঙ্গীকারবদ্ধ, সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাও বাণীতে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল’ (এফসিটিসি)-এ প্রথম স্বাক্ষর করে, ২০০৪ সালে তা অনুসমর্থন করে এবং এর আলোকেই ২০০৫ সালে প্রথম শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে বর্তমান সময়ের চাহিদা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আইনটিকে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করতে বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬ উপলক্ষে গৃহীত সরকারি-বেসরকারি সকল কর্মসূচির সার্বিক সাফল্য কামনা করেন।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বাণী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'পলিসি ডিরেক্টিভ' বা রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা। তামাকের কারণে বছরে প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং ৮৭ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি কোনো সাধারণ বিষয় নয়। একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি গঠন করতে হলে এই নীরব ঘাতককে রুখতেই হবে।
তবে কাগজের আইন আর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে এখনো কিছু বড় ফাঁক রয়ে গেছে। আইন অনুযায়ী স্কুল ও হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও রাজধানীর অলিতে-গলিতে প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনেই ব্যাঙের ছাতার মতো তামাকের দোকান বা টং দোকান দেখা যায়। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা নাটকে এখনো পরোক্ষভাবে ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শন পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
প্রধানমন্ত্রী নিজে যেহেতু নতুন বিধিবিধানের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন, তাই এখন প্রধান দায়িত্ব প্রশাসনের। শুধু দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দুই সিটি করপোরেশন, পুলিশ প্রশাসন এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে সাথে নিয়ে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে। একই সাথে ই-সিগারেট বা ভেপিংয়ের মতো নতুন ধারার নেশা যা তরুণদের নিঃশব্দে ধ্বংস করছে, তার আমদানী ও বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি। জনগণের সম্মিলিত অংশীদারিত্ব এবং সরকারের জিরো-টলারেন্স নীতিই কেবল পারবে ২০৪০ সালের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
আরও পড়ুন: সিনেপ্লেক্স এখন নিজের বেডরুমেই! বাজারে এলো ওয়াইফাই-৬ ও অ্যান্ড্রয়েড ১৪ সমৃদ্ধ আল্ট্রা-পোর্টেবল মিনি প্রজেক্টর
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন