আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| প্রতীকী ছবি |
ভবানীপুরে মহানাটক: নিজের ঘরেই হারলেন মমতা
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্র। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হারের পর যে ভবানীপুর মমতাকে রক্ষা করেছিল, ২০২৬-এ সেই ভবানীপুরই তাঁকে ফিরিয়ে দিল। টানটান উত্তেজনার এই লড়াইয়ে ১৫,১১৪ ভোটের ব্যবধানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী।
সকালে পোস্টাল ব্যালট গণনায় শুভেন্দু এগিয়ে থাকলেও দুপুরে মমতা ১৯ হাজার ভোটের লিড নিয়ে জয়ের পথ পরিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু বিকেলের পর থেকেই দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে। ১৮তম রাউন্ড শেষে নাটকীয়ভাবে এগিয়ে যান শুভেন্দু। শেষ পর্যন্ত নিজের খাসতালুকে পরাজিত হন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী। জয়ের পর শুভেন্দু অধিকারী এই বিজয়কে ‘অরাজক শাসনের অবসান’ এবং ‘হিন্দুত্ববাদের জয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, অ-মুসলিম ভোটারদের সংহতিই এই অসাধ্য সাধন করেছে।
দিল্লিতে মোদির জয়ধ্বনি: ‘পরিবর্তন হয়ে গেছে’
পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফোটার খবর নিশ্চিত হতেই দিল্লির বিজেপি সদর দপ্তরে অকাল দেওয়ালি শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক আবেগপূর্ণ বার্তায় পশ্চিমবঙ্গবাসীকে অভিনন্দন জানান। তিনি বিশেষভাবে বাংলায় তিন শব্দের একটি শক্তিশালী বার্তা দেন— ‘পরিবর্তন হয়ে গেছে’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর, আজ সর্বত্র পদ্ম ফুটেছে। এই জয় কেবল বিজেপির নয়, এটি বাংলার মানুষের সুশাসনের আকাঙ্ক্ষার জয়।” তিনি দলীয় কর্মীদের শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এটি ‘বদলা’ বা প্রতিশোধের সময় নয়, বরং ‘বদলাভ’ বা পরিবর্তনের সময়। বাংলার ভয়মুক্ত পরিবেশে উন্নয়নের নতুন সূর্য উদিত হবে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।
পরাজয় মেনে নেননি মমতা: কারচুপির অভিযোগ
নির্বাচনী ফলাফলকে ‘অনৈতিক’ এবং ‘লুট’ বলে আখ্যা দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন বিজেপির শাখা সংগঠনে পরিণত হয়েছে। তাঁর দাবি, অন্তত ১০০টি আসনে কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং কমিশনের যোগসাজশে কারচুপি করা হয়েছে।
মমতা বলেন, “ভবানীপুর থেকে ৬০ হাজার ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি জনগণের রায় নয়, এটি সরকারি কারচুপি। আমরা এই হার মেনে নিচ্ছি না, আবারও রাজপথে ঘুরে দাঁড়াব।” তৃণমূলের অভিযোগ, ডায়মন্ড হারবারসহ একাধিক আসনে জয়ী প্রার্থীদের শংসাপত্র দিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেরি করা হয়েছে।
বিজেপির জয়ের পেছনের সমীকরণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির এই অভাবনীয় জয়ের পেছনে কয়েকটি প্রধান ফ্যাক্টর কাজ করেছে:
১. আরজি কর কাণ্ডের প্রভাব: আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক ছাত্রীর নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের নারী সমাজকে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। সাধারণ মানুষের ‘তিলোত্তমার বিচার চাই’ আন্দোলন ব্যালট বক্সে বড় প্রভাব ফেলেছে।
২. তীব্র প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া: দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূলের নিচুতলার নেতাদের দুর্নীতি এবং তোলাবাজি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে পাহাড়প্রমাণ ক্ষোভ জমেছিল।
৩. বিজেপির সাংগঠনিক সংহতি: শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদারদের নেতৃত্বে বিজেপি বুথ স্তরে নিজেদের সংগঠনকে শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে, যা গত নির্বাচনে ঘাটতি ছিল।
৪. হিন্দুত্ববাদ ও মেরুকরণ: সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে অনুপ্রবেশ এবং ধর্মীয় তুষ্টির রাজনীতির বিরুদ্ধে বিজেপির প্রচার ভোটারদের মেরুকরণে সাহায্য করেছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
পশ্চিমবঙ্গের এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন কেবল একটি রাজ্যের ক্ষমতার বদল নয়, এটি ভারতীয় রাজনীতির মেরুকরণে এক বিশাল মাইলফলক। বিডি নিউজ সত্যকথা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূলের যে ‘অজেয়’ মানসিকতা তৈরি হয়েছিল, আরজি কর কাণ্ড সেটি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
বাংলার মানুষ এবার প্রমাণ করেছে যে, উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা তাঁদের কাছে প্রধান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজয়ের দায় কমিশনের ওপর চাপালেও, নিজের দলের অন্তর্কোন্দল এবং জনবিচ্ছিন্নতা ঢাকতে পারবেন না। অন্যদিকে, বিজেপিকে এখন বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। কারণ ২০০-র বেশি আসন নিয়ে জয়লাভ করার পর প্রত্যাশার পারদ এখন তুঙ্গে। বিজেপি যদি দ্রুত উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারে, তবে বাংলার মানুষ তাঁদেরও রেহাই দেবে না। বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের এই স্থিতিশীলতা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: শপথ নিলেন সংরক্ষিত আসনের ৪৯ নারী সংসদ সদস্য: সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন