![]() |
| ছবিঃ সংগৃহীত |
ভাঙল ৪৯ বছরের অচলায়তন: এমজিআরের উত্তরসূরি?
যদি বিজয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তবে দীর্ঘ ৪৯ বছর পর তামিলনাড়ুতে কোনো চলচ্চিত্র তারকা সরাসরি এই শীর্ষ আসনে বসবেন। এর আগে ১৯৭৭ সালে কিংবদন্তি অভিনেতা এম জি রামচন্দ্রন (এমজিআর) একই কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে জয়ললিতার মতো বড় তারকারা মুখ্যমন্ত্রী হলেও তারা মূলত এমজিআরের গড়া দলের উত্তরাধিকার হিসেবে ক্ষমতায় এসেছিলেন।
বিজয়ের বিশেষত্ব হলো, তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি দল গড়ে এই মাইলফলক স্পর্শ করার পথে রয়েছেন। রজনীকান্ত বা কমল হাসানের মতো সমসাময়িক তারকারা যা করতে পারেননি, বিজয় তা করে দেখিয়েছেন খুব অল্প সময়ে এবং সুপরিকল্পিত উপায়ে। তিনি আগের অভিনেতাদের মতো অভিনয়জগৎকে আঁকড়ে ধরে রাজনীতির ময়দানে নামেননি।
এক দশকের নীরব প্রস্তুতি: বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম
থালাপথি বিজয়ের এই উত্থান মোটেও আকস্মিক ছিল না। এর পেছনে ছিল এক দশকেরও বেশি সময়ের নীরব ও গভীর প্রস্তুতি। শুরুটা হয়েছিল ২০০৯ সালে। বিজয় তাঁর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা হাজারো ফ্যান ক্লাবগুলোকে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ নামে একটি সংগঠনের পতাকাতলে নিয়ে আসেন। শুরুতে এটি সমাজসেবামূলক কাজ করলেও তৃণমূল পর্যায়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়, যা এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
২০১১ সালে এই সংগঠন এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন দেয়, যা ছিল বিজয়ের প্রথম রাজনৈতিক পদক্ষেপ। তিনি মূলত দেখতে চেয়েছিলেন, তাঁর তারকা খ্যাতি দিয়ে ভোট টানা যায় কি না। ২০২০-এর দশকের শুরুতে সিনেমার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিজয়ের উপস্থিতি ও কথাবার্তায় রাজনৈতিক বার্তা থাকতে শুরু করে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনসহ কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা এবং বেকারত্ব ও দুর্নীতির মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সাহসী অবস্থানের কারণে বিজয় তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন।
সিনেমার রঙিন জগত ত্যাগ: এক নির্ভুল বার্তা
রাজনীতির প্রতি নিজের একাগ্রতা প্রমাণ করতে বিজয় তাঁর তিন দশকের সফল অভিনয় ক্যারিয়ারের ইতি টানেন। প্রায় ৭০টি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর সিনেমার রঙিন জগত ত্যাগ করার তাঁর এই সিদ্ধান্ত ভোটারদের কাছে একটি নির্ভুল বার্তা দিয়েছিল যে, রাজনীতি তাঁর কাছে কোনো শখের বিষয় নয়।
তিনি খুব পরিষ্কারভাবেই সবকিছু জানান। বিজয় বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তাঁর দল একাই লড়বে। ভোটের আগে তারা কারও সঙ্গে জোট বাঁধবে না। রাজ্যের বড় দুই দল ডিএমকে ও এআইএডিএমকের বাইরে তারা একটি পরিচ্ছন্ন বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে চায়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে তাঁর সমালোচনা ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তিনি চলচ্চিত্রের গণ্ডির বাইরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চান।
টিভিকে: সাধারণ ফ্যান ক্লাব থেকে পূর্ণাঙ্গ দল
টিভিকে পরবর্তী দুই বছরে একটি সাধারণ ফ্যান ক্লাব থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। তারা জেলা কমিটি, নির্বাচনী এলাকার ইউনিট ও ভোটকেন্দ্রভিত্তিক দল গঠন করে। সেই সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির বিষয়গুলোকে তারা তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে।
বিজয়কে গতানুগতিক বক্তা হিসেবে নয়, বরং মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা একজন নেতা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরা হয়। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি নিজেকে প্রথাগত বক্তা নয়, বরং মানুষের কথা শোনার নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। এমনকি ২০২৫ সালে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পদদলিত হওয়ার ঘটনায় তাঁর দায়িত্বশীল ভূমিকা ও ভুল শুধরে নেওয়ার মানসিকতা দলটির শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিয়ে ভোটারদের আস্থাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
থালাপথি বিজয়ের এই রাজনৈতিক উত্থান কেবল তামিলনাড়ু নয়, সমগ্র ভারতের রাজনীতির জন্য এক বড় বার্তা। বিডি নিউজ সত্যকথা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে, বিজয়ের এই বিজয় মূলত প্রথাগত রাজনীতির প্রতি মানুষের বীতশ্রদ্ধার প্রতিফলন। ডিএমকে ও এআইএডিএমকের মতো প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর বাইরে মানুষ একটি পরিচ্ছন্ন ও শক্তিশালী বিকল্প খুঁজছিল, বিজয় ঠিক সেই জায়গাতেই আঘাত করেছেন।
প্রথমত, বিজয়ের তৃণমূল পর্যায়ের শক্তিশালী সংগঠন এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ডিএমকের মতো বড় দলকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিজয়ের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সাহসী কণ্ঠ তরুণ ভোটারদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বিজয়ের সিনেমার জগত ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত তাঁকে অন্যান্য অভিনেতা-রাজনীতিবিদদের থেকে আলাদা করেছে। মানুষ বিশ্বাস করেছে যে বিজয় সত্যিই জনসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে চান।
তৃতীয়ত, বিজয়ের এই উত্থান ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য এক বড় অস্বস্তির কারণ। বিজয় মোদি সরকারের দমননীতির কড়া সমালোচনা করে তামিল অস্মিতাকে জাগ্রত করেছেন, যা বিজেপিকে তামিলনাড়ুতে কোণঠাসা করেছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের তামিলনাড়ুর এই রাজনৈতিক পট পরিবর্তন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, বিজয়ের এই জয় ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক যুগের সূচনা করতে পারে।
আরও পড়ুন: বাংলার মসনদে এবার বিজেপি: মমতার দুর্গে শুভেন্দুর হানা, দিল্লিতে মোদির কণ্ঠে ‘পরিবর্তন হয়ে গেছে’
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন