পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর ফল প্রকাশিত হওয়ার পর চারদিকে এখন একটাই আলোচনা—কীভাবে ধূলিসাৎ হলো তৃণমূল কংগ্রেসের শক্তিশালী দুর্গ? ১৫ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকার পর মমতা ব্যানার্জীর দল যে অভাবনীয় নির্বাচনি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে, তা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিশাল ধাক্কা। যদিও মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী এবং তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক ব্যানার্জী আজ বিকেলে সাংবাদিক বৈঠকে ‘আসন লুট’ ও ‘ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া’র অভিযোগ আনতে চলেছেন, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে—রাজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি এখন সরকার গঠনের পথে।
![]() |
| গণতন্ত্রের রায় এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা - বাংলার নারীর দুই ভিন্ন রূপ। (প্রতীকী ছবি) |
১. নারী ভোটব্যাংকে বিশাল ধস ও আরজি করের ছায়া
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা ব্যানার্জীর প্রধান শক্তি ছিল নারী ভোটাররা। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’ বা ‘সবুজ সাথীর’ মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি রাজ্যের নারীদের মন জয় করেছিলেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই ভোটব্যাংকে বড় ফাটল ধরেছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো নারী নিরাপত্তার ইস্যুতে প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা।
দু’বছর আগে কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে ডিউটিরত অবস্থায় একজন নারী চিকিৎসকের নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি পুরো বাংলার মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। ‘অভয়ার’ বিচারের দাবিতে যে স্বতঃস্ফূর্ত জনআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার প্রভাব পড়েছে ব্যালট বাক্সে। পানিহাটির মতো তৃণমূলের দুর্গে আরজি করের নির্যাতিতার মায়ের বিজেপি প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করা এই ক্ষোভের এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।
২. ভোটার তালিকা সংস্কার বা এসআইআরের ধাক্কা
ভোটের ঠিক আগে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (SIR) ফলে প্রায় ৯০ লাখ নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তৃণমূলের দাবি, এর মধ্যে বড় একটি অংশ তাদের বৈধ ভোটার ছিল। কিন্তু আসনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বহু ভুয়া বা মৃত ভোটারের নাম বাদ পড়ায় বিজেপির দীর্ঘদিনের দাবিই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বিজেপি অভিযোগ করেছিল যে, এই ভুয়া ভোটারদের ওপর ভিত্তি করেই তৃণমূল বছরের পর বছর জয়ী হয়ে এসেছে। এবার স্বচ্ছ তালিকা হওয়ায় সেই অন্যায্য সুবিধা তারা আর পায়নি।
৩. লাগামহীন দুর্নীতি ও বেকারত্বের হতাশা
তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনে ‘কাটমানি’, ‘সিন্ডিকেট রাজ’ এবং নিয়োগ দুর্নীতির মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল। অনেক বড় বড় নেতা জেল খাটলেও দুর্নীতির রাশ টানতে পারেনি দল। তার ওপর রাজ্যে নতুন কোনো বড় শিল্প বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা তরুণ প্রজন্মকে শাসক দলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। বেকারদের জন্য মাসিক ১৫০০ টাকা ভাতার শেষ মুহূর্তের চেষ্টা কোনো কাজে আসেনি।
৪. হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ ও ‘সফট হিন্দুত্ব’র ব্যর্থতা
রাজ্যের ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটার বরাবরই মমতা ব্যানার্জীর প্রধান ভরসা ছিল। কিন্তু এবার সেই মুসলিম ভোটের পাল্টা হিসেবে হিন্দু ভোটরা বিজেপির পক্ষে চূড়ান্তভাবে সংহতি (Consolidation) প্রকাশ করেছে। মমতা ব্যানার্জী মুসলিম তোষণের অভিযোগ ঢাকতে মন্দিরে অনুদান এবং ধর্মীয় উৎসব পালনের মতো ‘সফট হিন্দুত্ব’ কার্ড খেললেও হিন্দু ভোটাররা তাঁর ওপর ভরসা করতে পারেনি। মালদা বা মুর্শিদাবাদের মতো মুসলিম প্রধান জেলাগুলোতেও বিজেপি আসন পাওয়ায় মেরুকরণের গভীরতা ফুটে উঠেছে।
৫. নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা
অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবারের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন ছিল নজিরবিহীন শান্ত ও সুষ্ঠু। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন কমিশন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। ঢালাওভাবে পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকদের বদলি করা হয়। ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছে। আগে যেখানে শাসক দল অনেক ক্ষেত্রে পেশিশক্তি ব্যবহার করত, এবার সেই সুযোগ তারা পায়নি। কমিশনের এই কঠোর অবস্থান তৃণমূলের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
পশ্চিমবঙ্গের এই পালাবদল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলার রাজনীতি এখন আর কেবল ‘ইমোশন’ বা ‘ভাতা’র ওপর টিকে নেই। মানুষ এখন সুশাসন, নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের প্রশ্নে সরব। মমতা ব্যানার্জীর সরকার জনকল্যাণমূলক কাজ করলেও দুর্নীতি এবং নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে তাদের ইমেজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা’র পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আরজি কর কাণ্ড ছিল তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেক। এই আন্দোলনটি কেবল রাজপথে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা বাংলার গ্রাম-গঞ্জের প্রতিটি ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। পরাজয় স্বীকার না করে ‘আসন লুট’ বা ‘কারচুপির’ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে তৃণমূল হয়তো তাদের কর্মীদের শান্ত করতে চাইবে, কিন্তু জনতার রায় পাল্টানোর ক্ষমতা তাদের নেই। ২০২৬-এ এসে পশ্চিমবঙ্গ এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে পা রাখল।
আরও পড়ুন: থালাপথি বিজয়ের ঐতিহাসিক উত্থান: সিনেমার পর্দা ছাপিয়ে এবার তামিলনাড়ুর রাজনীতির কিংমেকার
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন