![]() |
| সর্তক থাকুন, অনলাইন ব্যাংকিংয়ে আপনার অর্থ সুরক্ষিত রাখুন। |
প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল: সতর্কবার্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বার্তায় জানানো হয়েছে, সাইবার অপরাধীরা এখন অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহার করে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অর্থ আত্মসাতের ঘটনাগুলো দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো অবস্থাতেই নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, মোবাইল ব্যাংকিং পিন (PIN), পাসওয়ার্ড কিংবা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (OTP) কারো সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কখনোই ফোনে বা মেসেজে আপনার গোপন পিন বা ওটিপি জানতে চাইবেন না। যদি কেউ নিজেকে ব্যাংকের লোক পরিচয় দিয়ে আপনার পাসওয়ার্ড চায়, তবে নিশ্চিতভাবেই তিনি একজন প্রতারক।
সন্দেহজনক লিংক ও ক্ষতিকর অ্যাপের ফাঁদ
হ্যাকারদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হলো ‘ফিশিং লিংক’। অনেক সময় লটারি জয়, ক্যাশব্যাক অফার কিংবা আইফোন জেতার প্রলোভন দেখিয়ে মেসেজ বা ইমেইলে একটি লিংক পাঠানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করেছে, এ ধরনের সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করা মাত্রই আপনার ফোনের বা কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ অপরাধীদের হাতে চলে যেতে পারে।
এছাড়াও, অফিসিয়াল স্টোর (যেমন গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর) বাদে অন্য কোনো অজানা উৎস থেকে ‘ফ্রি অ্যাপ’ বা গেম ডাউনলোড ও ইনস্টল করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এসব অ্যাপের মাধ্যমে আপনার ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট, মেসেজ ও ব্যাংকিং অ্যাপের তথ্য চুরি করা অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। পাশাপাশি অনলাইন জুয়া ও অননুমোদিত সাইটে আর্থিক লেনদেন থেকেও কঠোরভাবে দূরে থাকতে বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ঋণের প্রস্তাব
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইদানীং একটি নতুন ধরনের প্রতারণা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ (IMF), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-সহ বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানের লোগো ও নাম ব্যবহার করে লাইসেন্সবিহীন অ্যাপ বা জামানতবিহীন ঋণের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জানিয়েছে যে, এ ধরনের কোনো আন্তর্জাতিক বা জাতীয় প্রতিষ্ঠান সরাসরি গ্রাহককে অনলাইনে ঋণ বা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয় না। অধিক লাভের আশায় এসব ছদ্মবেশী অ্যাপে বিনিয়োগ করা মানেই নিশ্চিত অর্থ হারানো। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে অনলাইনে পরিচয় হয়ে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনে জড়ানো এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি।
সুরক্ষিত থাকার উপায়: যা করতে হবে আপনাকে
নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত করতে গ্রাহকদের কয়েকটি মৌলিক অভ্যাসের ওপর জোর দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক:
নিয়মিত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন: আপনার ব্যাংকিং অ্যাপ ও ইমেইলের পাসওয়ার্ড প্রতি তিন মাস অন্তর পরিবর্তন করুন।
টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন: লেনদেনের ক্ষেত্রে সবসময় টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (2FA) সক্রিয় রাখুন।
অফিসিয়াল অ্যাপ ব্যবহার: শুধুমাত্র ব্যাংকের সরবরাহ করা অফিসিয়াল অ্যাপ ব্যবহার করুন এবং নিয়মিত আপডেট দিন।
পাবলিক ওয়াই-ফাই বর্জন: রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড বা ক্যাফেটেরিয়ার উন্মুক্ত ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে কখনোই ব্যাংকিং লেনদেন করবেন না। এতে ডেটা হ্যাক হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
ভুক্তভোগীদের জন্য করণীয়: ১৬২৩৬ হটলাইন
যদি কোনো গ্রাহক প্রতারণার শিকার হন বা ব্যাংকিং সেবা নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকে, তবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হটলাইন নম্বর ১৬২৩৬-এ কল করে তৎক্ষণাৎ অভিযোগ জানানো যাবে। এছাড়াও প্রয়োজনে নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাস্টমার কেয়ারকে দ্রুত অ্যাকাউন্ট লক করার জন্য অনুরোধ করতে বলা হয়েছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সময়োপযোগী নির্দেশনা অত্যন্ত প্রশংসনীয় হলেও, শুধু নির্দেশনাই যথেষ্ট নয়। বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও ডিজিটাল নিরাপত্তার সচেতনতা এখনো তলানিতে। হ্যাকাররা মূলত মানুষের ‘লোভ’ এবং ‘ভয়’—এই দুটি আবেগ নিয়ে খেলা করে। লটারির প্রলোভন দেখিয়ে লোভ এবং অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে তথ্য হাতিয়ে নেওয়াই তাদের মূল কৌশল।
আমাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলের মানুষেরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে বেশি প্রতারিত হচ্ছেন। এর কারণ তারা অনেক সময় পরিচিত দোকানদার বা অন্য কারো সাহায্য নিয়ে লেনদেন করেন, যার ফলে পিন নম্বর প্রকাশ হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং খাতের নিরাপত্তা দেয়াল শক্তিশালী করার পাশাপাশি গ্রাহকদের ব্যক্তিগত সচেতনতাই হতে পারে এই ডিজিটাল ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। ব্যাংকগুলোর উচিত আরও বেশি করে সাইবার সিকিউরিটি ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
আরও পড়ুন: ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের পতনের নেপথ্যে ৫টি প্রধান কারণ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন