মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের ৩০তম দিনে যুদ্ধের মোড় নাটকীয়ভাবে ঘুরে গেছে। আগ্রাসনের পাল্টা জবাব দিতে আজ রোববার (২৯ মার্চ) তেহরান তাদের আক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে ইরানের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়েছে লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। দুই পক্ষের যৌথ ও সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কার্যত থমকে গেছে পুরো ইসরাইল। ইহুদিবাদী ভূখণ্ডের শতাধিক শহরকে লক্ষ্যবস্তু করে চালানো এই হামলায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল এক এলাকা।
![]() |
| ইসরাইলি শহর হাইফায় ইরান ও হিজবুল্লাহর বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা (প্রতীকী ছবি) |
১০০ শহরে সাইরেন ও হাইফায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত
ইসরাইলি সামরিক সূত্র ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, আজ ভোর থেকেই উত্তর ইসরাইলে বৃষ্টির মতো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও হিজবুল্লাহর রকেট আছড়ে পড়তে শুরু করে। এই জোড়া হামলার ভয়াবহতায় হাইফা, তেল আবিবসহ ১০০টিরও বেশি শহরে একটানা বিপদাশঙ্কা সংকেত বা সাইরেন বাজানো হয়েছে। লাখ লাখ ইসরাইলি নাগরিক আতঙ্কে বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছেন।
ইসরাইলি রেডিওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাইফা উপসাগরীয় এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে ব্যাপক বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যদিও ইসরাইলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার দাবি করেছে, তবে ড্রোন ও রকেটের বড় একটি অংশ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা।
‘সানডে ডন’: আইআরজিসি-র নতুন অভিযান
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ‘সানডে ডন’ (Sunday Dawn) বা ‘রোববার ভোর’ নামক একটি বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানে একযোগে ৮৬টি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
আইআরজিসি-র দাবি অনুযায়ী, এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর গোপন আস্তানা এবং সামরিক অবকাঠামো। বিশেষ করে ইরাকের ভিক্টোরিয়া ঘাঁটি, কুয়েতের আরিফজান এবং সৌদি আরবের আল খার্জে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিকে নিশানা করা হয়েছে। তেহরানের ভাষ্যমতে, এসব ঘাঁটি থেকে মার্কিন বাহিনী তাদের ড্রোন ও আকাশপথ পরিচালনা করত, যা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
মার্কিন নৌবহর ও বিভিন্ন ঘাঁটিতে হামলা
শুধু ইসরাইল নয়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দুগুলোতেও আঘাত হেনেছে ইরান। বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহর (US 5th Fleet), আবুধাবির আল ধাফরা এবং নেগেভ মরুভূমির সামরিক স্থাপনাগুলোতে বড় ধরণের বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন বাহিনী ইসরাইলকে মদত দেওয়া বন্ধ না করলে তাদের প্রতিটি ঘাঁটিকে আগুনের গোল্লায় পরিণত করা হবে।
স্পিকার গালিবাফের হুঁশিয়ারি: ‘শত্রুদের নীল নকশা সফল হবে না’
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ৩০ দিন পূর্তি উপলক্ষে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, “শত্রুপক্ষ মুখে আলোচনার কথা বললেও গোপনে তারা স্থল হামলার নীল নকশা সাজাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র একটি অবাস্তব ১৫ দফা প্রস্তাবের মাধ্যমে তাদের ইচ্ছা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। যুদ্ধে তারা যা অর্জন করতে পারেনি, আলোচনার টেবিলে তা আদায়ের চেষ্টা করছে।”
গালিবাফ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। মার্কিন বা ইসরাইলি সেনারা যদি ভুল করেও ইরানের মাটিতে পা রাখার চেষ্টা করে, তবে তাদের ওপর এমন কঠোর আঘাত হানা হবে যা ইতিহাসে নজিরবিহীন হয়ে থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্য কি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন:
১. সমন্বিত আক্রমণ: ইরান ও হিজবুল্লাহর এই যৌথ হামলা প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলের প্রতিরোধ শক্তিগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংগঠিত। ইসরাইলের ‘আয়রন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে তারা নতুন কৌশল অবলম্বন করছে।
২. মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা: কুয়েত, সৌদি আরব ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হওয়ার অর্থ হলো—এই যুদ্ধ আর কেবল ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পুরো অঞ্চলের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে।
৩. কূটনৈতিক ব্যর্থতা: গালিবাফের বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আস্থার সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি নয়, যা সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করবে।
৪. বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব: পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই অস্থিরতা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে, যার প্রভাব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরও পড়বে।
আজকের এই বিধ্বংসী হামলা প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে কড়া বার্তা দিয়েছে। বিশ্ববাসী এখন শঙ্কিত নয়নে তাকিয়ে আছে—এই সংঘাত কি শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নেবে, নাকি কোনো কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটবে?
সূত্র: আল জাজিরা
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন