বিধ্বস্ত সেই ‘উড়ন্ত কমান্ড সেন্টার’
শনিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ এবং স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বোয়িং ই-৩ সেন্ট্রি (E-3 Sentry) বিমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বিমানটির টেইল নম্বর বা পরিচয় চিহ্ন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, যা এর ধ্বংস হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
মার্কিন বিমান বাহিনীর এই বিমানটিকে বলা হয় ‘উড়ন্ত কন্ট্রোল টাওয়ার’। এটি কেবল একটি বিমান নয়, বরং আকাশের কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার। অত্যাধুনিক রাডার প্রযুক্তিতে সজ্জিত এই বিমানটি শত শত কিলোমিটার দূর থেকে শত্রুর যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন শনাক্ত করতে সক্ষম। একটি ই-৩ সেন্ট্রি বিমান তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ২৭ থেকে ৩০ কোটি ডলার (প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি)।
হামলার ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান
গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) এবং শনিবারের ধারাবাহিক হামলায় প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরান একযোগে বেশ কয়েকটি ড্রোন ও মিসাইল নিক্ষেপ করে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে:
সেনা হতাহত: হামলায় অন্তত ১৫ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
বিমান ধ্বংস: একটি ই-৩ সেন্ট্রি এডব্লিউএসিএস বিমান পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি জ্বালানি সরবরাহকারী (Refueling) বিমান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অবকাঠামো: ঘাঁটির রানওয়ে এবং ড্রোন পরিচালনার অবকাঠামো লক্ষ্য করে নির্ভুলভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে।
আমেরিকার জন্য কেন এটি বড় ধাক্কা?
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বর্তমানে সচল অবস্থায় মাত্র ১৬টি বোয়িং ই-৩ সেন্ট্রি বিমান ছিল। সৌদি আরবে একটি ধ্বংস হওয়ার ফলে এই সংখ্যা কমে ১৫-তে দাঁড়িয়েছে। পেন্টাগন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই বিমানের কোনো সহজ প্রতিস্থাপনযোগ্য বিকল্প নেই।
সবচেয়ে কাছাকাছি বিকল্প হিসেবে ধরা হয় ই-৭ ওয়েজটেইল (E-7 Wedgetail) বিমানকে, যার একেকটির দাম প্রায় ৭০ কোটি ডলার (প্রায় ৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকা)। এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় বিষয় হলো—অঞ্চলটিতে মার্কিন বাহিনীর আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার ক্ষমতা সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুনঃ ইরান ও হিজবুল্লাহর বিধ্বংসী পাল্টা হামলায় কাঁপছে ইসরাইল, ১০০ শহরে সতর্কতা জারি
ইরানের সক্ষমতা ও রণকৌশল
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা ইরানের গোয়েন্দা এবং সামরিক সক্ষমতার এক বিরাট আস্ফালন।
১. নির্ভুল নিশানায় আঘাত: প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে অন্তত ৬টি এডব্লিউএসিএস বিমান মোতায়েন ছিল। ইরান ঠিক সেই বিমানটিকেই টার্গেট করেছে যেটি সবচেয়ে সক্রিয় ছিল।
২. হুমকির বাস্তবায়ন: হামলার দুইদিন আগেই ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই ঘাঁটি এবং নির্দিষ্ট নজরদারি বিমানগুলোকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিল। সেই হুমকি সরাসরি কার্যকর করা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র জন্য একটি বড় ব্যর্থতা।
৩. প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ: মার্কিন ও সৌদি আরবের সর্বাধুনিক পেট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে ঘাঁটির ভেতরে আঘাত হানল, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
পেন্টাগনের নীরবতা ও উদ্বেগের কারণ
এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিমান ধ্বংসের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, এটি একটি ‘কৌশলগত বিপর্যয়’। নজরদারি বিমানটি হারানোয় এখন মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো অনেকটা ‘অন্ধ’ অবস্থায় থাকবে, কারণ তারা আকাশপথে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো শক্তিশালী রাডার সাপোর্ট হারাল।
সৌদি আরবের মাটিতে মার্কিন ঘাঁটিতে এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। ইরানের এই দুঃসাহসিক পদক্ষেপ ওয়াশিংটনকে বড় ধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে ফেলে দিয়েছে। এর ফলে অঞ্চলে বড় ধরনের পাল্টা হামলার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে, যা পুরো বিশ্বকে এক অনিশ্চিত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, বিবিসি ও টাইমস অব ইসরায়েল।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন