বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দেশের অর্থনৈতিক খাতে ব্যাপক সংস্কার শুরু করে। বিশেষ করে প্রবাসীদের আস্থা বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রেরণে জটিলতা নিরসন এবং হুন্ডি দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান এই রেকর্ড ভাঙা অর্জনে মূল ভূমিকা পালন করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের প্রতি প্রবাসীদের আস্থা এবং বৈধ পথে টাকা পাঠানোর আহ্বানে ব্যাপক সাড়া মেলায় এই অবিশ্বাস্য প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
ভাঙল এক বছরের পুরনো রেকর্ড
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসার রেকর্ডটি ছিল ২০২৫ সালের মার্চ মাসে। সে সময় দেশে ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার এসেছিল। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বর্তমান সরকারের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল প্রবাসী আয়। মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, “চলতি মার্চের ২৮ দিনেই ৩৩৩ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল সুসংবাদ।”
অর্থবছরের হিসেবেও বড় উল্লম্ফন
কেবল একক মাস নয়, চলতি অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্রেও রেমিট্যান্সের জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৫৭৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৮.৮০ শতাংশ। বর্তমান গতিধারা অব্যাহত থাকলে এই অর্থবছর শেষে বাংলাদেশ রেমিট্যান্স আহরণে বিশ্বমঞ্চে নতুন নজির স্থাপন করবে।
আরও পড়ুনঃ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের স্বস্তি: বাতিল হচ্ছে প্রিপেইড মিটার ভাড়া
কেন এই রেকর্ড প্রবাহ?
রেমিট্যান্সের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা:
১. সুশাসনের প্রভাব: বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে হুন্ডি প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে এবং প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছেন।
২. ঈদুল ফিতরের প্রভাব: প্রতি বছরই রমজান ও ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা তাদের পরিবার-পরিজনের উৎসবের খরচ মেটাতে বেশি পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
৩. মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা: ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রবাসীদের মধ্যে এক ধরণের অনিশ্চয়তা কাজ করছে। যুদ্ধের আশঙ্কায় অনেক প্রবাসী তাদের দীর্ঘদিনের সঞ্চিত অর্থ আগেভাগেই দেশে থাকা স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
৪. বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা: বর্তমানে ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক ও স্বচ্ছ হওয়ায় প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলেই ভালো দাম পাচ্ছেন।
রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত কয়েক বছর ধরে চাপের মুখে থাকলেও, রেমিট্যান্সের এই সুবাতাস বর্তমান সরকারের জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
রিজার্ভের শক্তিশালী অবস্থান: এই ৩.৩৩ বিলিয়ন ডলার সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যোগ হবে, যা আমদানি ব্যয় মেটাতে এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সরকারকে সহায়তা করবে।
টাকার মান স্থিতিশীলতা: বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়লে টাকার মানের ওপর চাপ কমবে, যা পরোক্ষভাবে নিত্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি: রেমিট্যান্সের এই বিশাল অর্থ সরাসরি দেশের তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে।
বর্তমান সরকারের অধীনে রেমিট্যান্স প্রবাহে যে গতির সঞ্চার হয়েছে, তা জাতীয় অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি প্রবাসীদের জন্য বিমা সুবিধা, বিমানবন্দরে সম্মাননা এবং বিনিয়োগের বিশেষ সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে, তবে এই রেমিট্যান্স প্রবাহ আগামীতে ৫ বিলিয়ন ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন