সত্যকথা ডেস্ক
পুঁজিবাজারে ধস: এক মাসে ১২০ বিলিয়ন ডলার উধাও
সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত মাত্র ৩০ দিনে দুবাই ও আবুধাবির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য ১২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি কমে গেছে। বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুবাইয়ের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক ১৬ শতাংশ নিচে নেমেছে, যা পার্শ্ববর্তী আবুধাবির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি পতন। এই পতন স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আঞ্চলিক অস্থিরতা দুবাইয়ের মতো একটি উন্মুক্ত অর্থনীতির জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
আবাসন খাতে রক্তক্ষরণ: বুর্জ খলিফার নির্মাতাদেরও করুণ দশা
দুবাইয়ের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণভোমরা হলো আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাত। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এই খাতে লেনদেনের পরিমাণ ১৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু চলমান সংঘাত সেই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে আবাসন লেনদেন কমেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। এমনকি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় বর্তমান বিক্রি অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী ও মালিকরা লোকসান এড়াতে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কম দামে সম্পত্তি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশ্বের উচ্চতম ভবন বুর্জ খলিফার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'এমার প্রপার্টিজ'-এর শেয়ারমূল্য এক ধাক্কায় ২৫ শতাংশের বেশি কমেছে। আবাসন খাতের এই পতন সরাসরি দেশটির জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিমান ও পর্যটন: 'নিরাপদ গন্তব্য' ইমেজে বড় ধাক্কা
সংযুক্ত আরব আমিরাত এতদিন নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে 'নিরাপদ ও বিলাসপূর্ণ গন্তব্য' হিসেবে প্রচার করে আসছিল। ২০২৫ সালে ২ কোটির বেশি পর্যটক শহরটিতে ভ্রমণ করেছিলেন। তবে ইরানের হামলার ফলে সেই ভাবমূর্তি এখন হুমকির মুখে। বিশেষ করে ইউরোপীয় পর্যটক, যারা মোট পর্যটকের ২০ শতাংশের বেশি, তারা এখন দুবাই ভ্রমণে অনীহা দেখাচ্ছেন।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিমান চলাচল খাতের নজিরবিহীন ক্ষতি। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা বছরে প্রায় ৯.৫ কোটি যাত্রী পরিবহন করে, হামলার আশঙ্কায় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। মাত্র এক মাসেই ১৮ হাজার ৪০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এমিরেটস এবং ইতিহাদ এয়ারলাইনস তাদের কার্যক্রম সীমিত করায় কয়েক বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে দেশটি। হোটেলগুলোর বুকিং আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় মালিকরা বাধ্য হয়ে রুম ভাড়া কমিয়ে দিচ্ছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই সংকট শুধু সাময়িক কোনো পতন নয়, বরং এটি তাদের অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি গভীর দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। যদিও প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং ক্রাউন প্রিন্স শেখ হামদান বিন মোহাম্মদ বিভিন্ন প্রচারণামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্লেষক সংস্থা সিটি ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি ৪ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বিদেশি নাগরিকদের ওপর কঠোর নজরদারি এবং আটকের ঘটনাও প্রবাসীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আবাসন ও বিনিয়োগের জন্য ক্ষতিকর।
ইরানের হামলায় দেশটির পর্যটন ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে তাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, যতই শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি হোক না কেন, আঞ্চলিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা কোনো দেশের পক্ষেই সম্ভব নয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন