বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব এবার পড়তে যাচ্ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায়। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীসহ দেশের বড় শহরগুলোর অসহনীয় যানজট এবং জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করতে সরকার পুনরায় অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা করছে। তবে এবার শুধু অনলাইন নয়, বরং প্রথাগত সশরীরে পাঠদান এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ে একটি ‘ব্লেন্ডেড’ বা মিশ্র শিক্ষা পদ্ধতির রূপরেখা চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
![]() |
| জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মহানগরীর স্কুলে ‘ব্লেন্ডেড’ লার্নিং: সপ্তাহে ৩ দিন সশরীরে, ৩ দিন অনলাইনে পাঠদান। (প্রতীকী ছবি) |
কী এই ‘ব্লেন্ডেড’ লার্নিং মডেল?
শিক্ষার আধুনিক এই মডেলে শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে প্রতিদিন সশরীরে উপস্থিত না হয়ে আংশিক সময় ঘরে বসে অনলাইনে এবং বাকি সময় শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণ করবে। সভায় প্রস্তাব করা হয়েছে, সপ্তাহে তিন দিন সশরীরে (অফলাইন) এবং বাকি তিন দিন অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস পরিচালিত হবে। এতে করে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত খরচ যেমন কমবে, তেমনি গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর চাপ কমায় জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, জোড় ও বিজোড় রোল নম্বরের ভিত্তিতে বা দিন ভাগ করে এই পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। তবে শিক্ষকদের ক্ষেত্রে শিথিলতা থাকছে না; তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থেকেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ক্লাস পরিচালনা করবেন। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও কারিগরি বিষয়ের ব্যবহারিক বা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসগুলো বাধ্যতামূলকভাবে সশরীরে অনুষ্ঠিত হবে।
জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধের প্রভাব
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান ত্রিমুখী সংঘাত বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও পরিবহন খাতে। দীর্ঘ মেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় সরকার সরকারি-বেসরকারি অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলাচলের হার কমিয়ে আনতে চায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনে করছে, মহানগরীর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী যদি সপ্তাহে তিন দিন যাতায়াত বন্ধ রাখে, তবে প্রতিদিন কয়েক হাজার লিটার জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, করোনাকালীন অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ অনলাইন শিক্ষায় অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। তবে সে সময় পুরোপুরি অনলাইন নির্ভর হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সামাজিকীকরণ এবং মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। নতুন এই ‘ব্লেন্ডেড’ পদ্ধতি সেই সমস্যার সমাধান দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মহানগরীর প্রায় ৮৫ শতাংশ অভিভাবক এবং শিক্ষার্থী আংশিক অনলাইন শিক্ষার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট হওয়ার চেয়ে বাড়িতে বসে মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, প্রান্তিক বা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং স্মার্ট ডিভাইসের সহজলভ্যতা নিশ্চিত না করলে এই পদ্ধতিতে বৈষম্য তৈরি হতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের বক্তব্য
সভা শেষে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, “জ্বালানি সংকট একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। আমাদের দূরদর্শী হতে হবে। আমরা চাই না শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন থমকে যাক। তাই অনলাইন ও অফলাইনের সমন্বয়ে একটি আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রস্তাব আমরা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করছি। মন্ত্রিসভার সবুজ সংকেত পেলেই আনুষ্ঠানিকভাবে এর ঘোষণা দেওয়া হবে।”
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম সভায় তার অভিজ্ঞতা বিনিময় করে বলেন, “শিক্ষকরা সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাসের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত। এটি কার্যকর হলে প্রতিষ্ঠানের ওপরও শারীরিক চাপ কমবে এবং ডিজিটাল শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন