সত্যকথা রিপোর্ট
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) মানিকগঞ্জে আয়োজিত এক সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সরকারের এই নতুন লক্ষ্যমাত্রার কথা তুলে ধরেন। একইসাথে একটি জরুরি সার্কুলারের মাধ্যমে দেশের সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ ইউনিট’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন ক্যাশলেস বাংলাদেশ অপরিহার্য?
মানিকগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ উদ্যোগ’ সম্প্রসারণ বিষয়ক সেমিনারে আরিফ হোসেন খান জানান, প্রতি বছর নগদ টাকা ছাপানো, এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা পরিবহনে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। তিনি বলেন, "ডিজিটাল লেনদেন, বিশেষ করে 'বাংলা কিউআর' (Bangla QR) ব্যবহারের পরিধি বাড়াতে পারলে এই বিশাল প্রশাসনিক ব্যয় অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এটি কেবল সরকারের সাশ্রয় নয়, বরং সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও একটি বড় হাতিয়ার।"
তিনি আরও যোগ করেন, কাগজের নোট বহন করা কেবল ঝুঁকিপূর্ণই নয়, বরং এটি রোগ-জীবাণু ছড়ানোর অন্যতম মাধ্যম। টাকা পুরোনো হয়ে গেলে লেনদেনে সমস্যা হয় এবং চুরি-ডাকাতির ভয় লেগেই থাকে। ক্যাশলেস বা ডিজিটাল লেনদেনে এই ঝুঁকি শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং সময়ের অপচয় রোধ হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা: গঠিত হচ্ছে বিশেষ ইউনিট
ডিজিটাল লেনদেনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সকল বাণিজ্যিক ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (PSP) এবং পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের (PSO) জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করেছে।
সার্কুলার অনুযায়ী, আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রধান কার্যালয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ ইউনিট’ গঠন করতে হবে। এই ইউনিটের মূল কাজ হবে দেশজুড়ে ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সাধারণ মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনে উদ্বুদ্ধ করা।
ইউনিটের কাঠামো ও জনবল: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি
কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই ইউনিটটি কেবল নামমাত্র কোনো কমিটি হবে না। ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই ইউনিটের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকবেন একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (DMD)। অন্যদিকে এমএফএস বা পিএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ঠিক নিচের স্তরের একজন কর্মকর্তা এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
জনবল কাঠামোর বিষয়ে বলা হয়েছে, ব্যাংকের ইউনিটে কমপক্ষে ৪ জন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ২ জন স্থায়ী কর্মকর্তা থাকতে হবে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের জন্য একজন উপমহাব্যবস্থাপক (DGM) পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে 'ফোকাল পয়েন্ট' হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।
কী কাজ করবে এই ক্যাশলেস ইউনিট?
বিডি নিউজ সত্যকথার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ইউনিটের দায়িত্ব হবে অত্যন্ত ব্যাপক। তাদের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. রোডম্যাপ তৈরি: ডিজিটাল পেমেন্ট সম্প্রসারণে এলাকাভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন।
২. মার্চেন্ট অনবোর্ডিং: দেশের প্রতিটি ছোট-বড় ব্যবসায়ীকে কিউআর কোড বা পিওএস মেশিনের আওতায় আনা। বিশেষ করে খুচরা ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে এখন থেকে ‘বাংলা কিউআর’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
৩. গ্রাহক সচেতনতা: ডিজিটাল লেনদেনের ঝুঁকি কমাতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৃণমূল পর্যায়ে সেমিনার ও ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা।
৪. অভিযোগ নিষ্পত্তি: ডিজিটাল লেনদেনে কোনো গ্রাহক প্রতারিত হলে বা সমস্যায় পড়লে দ্রুততম সময়ে তার সমাধান নিশ্চিত করা।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্যাশলেস অর্থনীতি বাস্তবায়িত হলে দেশের ‘শ্যাডো ইকোনমি’ বা অপ্রদর্শিত অর্থের প্রভাব কমবে। প্রতিটি লেনদেন ডিজিটাল রেকর্ডভুক্ত থাকায় কর ফাঁকি দেওয়া কঠিন হবে, যা জাতীয় রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। এছাড়া স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ গড়ার লক্ষ্যে এটি একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, প্রতি বছর মার্চ মাসের শেষ কার্যদিবসের মধ্যে এই ইউনিটের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে হবে। নিয়ম ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন