সত্যকথা অনুসন্ধান
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সম্ভাব্য বিধ্বংসী যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন সাধারণ জনগণের উদ্দেশে একটি আবেগপূর্ণ ও নীতিগত ‘খোলা চিঠি’ লিখেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। বুধবার (১ এপ্রিল) বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’-তে এই চিঠিটি প্রকাশিত হয়। চিঠিতে তিনি মার্কিন নাগরিকদের ‘ভুল তথ্যের মেকানিজম’ বা অপপ্রচারের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবতাকে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
অপপ্রচারের বিরুদ্ধে পেজেশকিয়ানের চ্যালেঞ্জ
পেজেশকিয়ান দাবি করেন, ইরানকে বিশ্ববাসীর কাছে ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরাটা ঐতিহাসিক সত্য বা বর্তমানের বাস্তব পর্যবেক্ষণের সঙ্গে কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়। তার মতে, প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লালসা চরিতার্থ করতে এবং পশ্চিমা অস্ত্র শিল্পের বাজার টিকিয়ে রাখতেই ইরানকে জোর করে ‘শত্রু’ হিসেবে আবিষ্কার করা হচ্ছে।
চিঠিতে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন যে যুদ্ধ পরিচালনা করছে, তা কি আদৌ মার্কিন জনগণের কোনো উপকারে আসছে? নাকি এটি কেবল ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো অপরাধ থেকে বিশ্ববাসীর নজর সরানোর একটি সুপরিকল্পিত কৌশল? তিনি মার্কিন নাগরিকদের অনুরোধ করেন যেন তারা সেই সব মানুষের সঙ্গে কথা বলেন যারা ইরান ভ্রমণ করেছেন অথবা সেই সব সফল ইরানি অভিবাসীদের দিকে তাকান যারা বর্তমানে বিশ্বের নামী বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে অবদান রাখছেন।
ট্রাম্পের ‘যুদ্ধবিরতি’ দাবি ও ইরানের পাল্টা জবাব
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই চিঠিটি এমন এক সময়ে সামনে এল যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট তার কাছে ‘যুদ্ধবিরতির’ অনুরোধ জানিয়েছেন। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, ইরানের নতুন সরকারের শীর্ষ এক কর্মকর্তা (যার নাম তিনি উল্লেখ করেননি) শান্তি চাইছেন। ট্রাম্প আরও যোগ করেন, “যখন হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত, মুক্ত ও পরিষ্কার থাকবে তখন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি বিবেচনা করবে।”
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এবং খোদ প্রেসিডেন্টের চিঠি এই দাবিকে ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রেস টিভিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, পেজেশকিয়ান তার চিঠিতে কোথাও সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ করেননি। বরং তিনি ইরানের ‘বৈধ আত্মরক্ষা’ এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অনড় থাকার বার্তা দিয়েছেন।
মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও আত্মরক্ষার অধিকার
চিঠিতে পেজেশকিয়ান মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একটি বড় অংশ ইরানের চারপাশের দেশগুলোতে অবস্থান করছে এবং এই ঘাঁটিগুলো থেকেই সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ওপর আগ্রাসন চালানো হয়েছে। এমতাবস্থায় যেকোনো দেশ নিজের আত্মরক্ষার ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি দাবি করেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক অবকাঠামোতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কোনো যুদ্ধের উস্কানি নয়, বরং তা সম্পূর্ণ ‘বৈধ আত্মরক্ষা’।
তিনি আরও লিখেন, “ইরানের জনগণ আমেরিকা, ইউরোপ কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলোর সাধারণ মানুষের প্রতি কোনো বিদ্বেষ পোষণ করে না। এটি আমাদের সংস্কৃতির একটি গভীর মূলনীতি, কোনো সাময়িক রাজনৈতিক অবস্থান নয়।”
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত ৭০ লাখ ইরানি: স্পিকার গালিবাফের হুঁশিয়ারি
পেজেশকিয়ানের চিঠির রাজনৈতিক গুরুত্ব
(বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ)
ইরানের প্রেসিডেন্টের এই খোলা চিঠির পেছনে তিনটি প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য কাজ করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা:
১. পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি: পেজেশকিয়ান সরাসরি মার্কিন জনগণের আবেগ ও যুক্তির কাছে পৌঁছাতে চেয়েছেন। তিনি জানেন যে, আমেরিকার একটি বড় অংশ এই যুদ্ধের বিপক্ষে। জনগণের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ সৃষ্টি করাই তার মূল লক্ষ্য।
২. ট্রাম্পের ইমেজ ক্ষুণ্ণ করা: ট্রাম্প যখন ইরানকে ‘সহিংস ও গুন্ডাশাসিত’ হিসেবে চিত্রায়িত করছেন, তখন পেজেশকিয়ান ইরানকে ‘প্রাচীন ও ধারাবাহিক এক সভ্যতা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নিজেকে একজন মার্জিত ও বুদ্ধিমান নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
৩. সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন: চিঠিতে ইরানি অভিবাসীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি মার্কিন সমাজে ইরানিদের ইতিবাচক ইমেজ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন, যা যুদ্ধবিরোধী মনোভাবকে আরও উস্কে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা, সিএনএন এবং টাইম নিউজ।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন