সত্যকথা অনুসন্ধান
ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা মিরপুরের ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। তবে এই উচ্ছেদ অভিযান কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে সম্পন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন ডিএনসিসি প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান।
ফুটপাতে ব্যবসা আর নয়: বিকল্প ব্যবস্থার ঘোষণা
প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, মিরপুর-১০ থেকে ১ নম্বর পর্যন্ত মূল সড়ক ও ফুটপাতে আর কোনো ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না। তিনি বলেন, “আমরা চাই আমাদের এলাকার মানুষ ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করুক, কিন্তু সেটা সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে নয়। অন্ততপক্ষে মূল সড়কগুলো যাতে যানজটমুক্ত থাকে, সে লক্ষ্যেই আমরা এই পরিকল্পনা নিয়েছি।”
তবে ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে ডিএনসিসি বিকল্প স্থানে ব্যবসার ব্যবস্থা করে দেবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। প্রশাসক স্পষ্ট করেন যে, ফোর্স নিয়ে উচ্ছেদ করা সহজ হলেও মানবিক কারণে তারা আলোচনার পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “বিকল্প স্থানে আপনাদের জায়গা দেওয়া হবে, তবে ফুটপাত ছাড়ার মানসিক প্রস্তুতি আপনাদের এখন থেকেই নিতে হবে।”
চাঁদাবাজি বন্ধে 'টোকেন' পদ্ধতি
ফুটপাতে হকারদের কাছ থেকে প্রভাবশালী মহলের চাঁদা আদায়ের বিষয়টি দীর্ঘদিনের একটি ওপেন সিক্রেট। এই চাঁদাবাজি বন্ধে ডিএনসিসি প্রশাসক এক বৈপ্লবিক ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি করে 'টোকেন' প্রদান করা হবে।
প্রশাসক হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, “অতীতে প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে যারা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করাতো, সেই সুযোগ এখন বন্ধ। এই টোকেন থাকলে কেউ আপনাদের কাছে চাঁদা দাবি করতে পারবে না। কেউ চাঁদা চাইলে দেবেন না, সরাসরি সিটি কর্পোরেশনকে জানাবেন।”
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল
সভায় উপস্থিত হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, দীর্ঘ বছর ধরে ফুটপাতে ব্যবসা করেই তাদের সংসার চলে। হঠাৎ উচ্ছেদ করা হলে তারা চরম সংকটে পড়বেন। ব্যবসায়ীরা পুনর্বাসনের জন্য তিনটি প্রধান দাবি জানান:
১. নির্দিষ্ট এবং ব্যবসা উপযোগী স্থান বরাদ্দ।
২. মালামাল সরানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রদান।
৩. এমন স্থানে স্থানান্তর করা যেখানে ক্রেতাদের সমাগম থাকে।
ব্যবসায়ীদের এই দাবির প্রেক্ষিতে প্রশাসক ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গঠনের পরামর্শ দেন। এই প্রতিনিধি দল সরাসরি সিটি কর্পোরেশনের সাথে আলোচনায় বসে একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান বের করবে।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলি চাপে নতি স্বীকার নয়: ৬ মাসের দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি ইরানের
যানজট নিরসন ও মানবিক নগর পরিকল্পনা
(বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ)
ঢাকার মিরপুর এলাকাটি জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে অত্যন্ত জনবহুল। মিরপুর-১০ থেকে ১ নম্বর পর্যন্ত সড়কটি মিরপুরের 'লাইফলাইন' হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত ও রাস্তার একাংশ হকারদের দখলে থাকায় এখানে যানজট নিত্যদিনের সঙ্গী। ডিএনসিসির এই উদ্যোগকে নগর পরিকল্পনাবিদরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষণে কয়েকটি দিক উঠে এসেছে:
মানবিক উচ্ছেদ: সাধারণত উচ্ছেদ মানেই বুলডোজার আর পুলিশের অ্যাকশন। কিন্তু ডিএনসিসি প্রশাসক যেভাবে নিজে এসে হকারদের সাথে কথা বলেছেন, তা একটি নতুন দৃষ্টান্ত। এটি সামাজিক অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করবে।
চাঁদাবাজমুক্ত ফুটপাত: টোকেন প্রথা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে রাজনৈতিক ও স্থানীয় ক্যাডারদের পকেটে যাওয়া কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। এতে ব্যবসায়ীদের খরচ কমবে এবং তারা বৈধভাবে ব্যবসা করার সাহস পাবে।
যানজট নিরসন: মূল সড়কগুলো হকারমুক্ত হলে মিরপুরের যানজট অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চ্যালেঞ্জ হলো বিকল্প স্থানে ক্রেতাদের টেনে আনা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন