মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন খাদের কিনারায়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানের মুখে ইরান তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযান প্রতিহত করতে প্রায় ৭০ লাখ বেসামরিক ইরানি নাগরিক অস্ত্র হাতে তুলে নিতে প্রস্তুত রয়েছে।
৭০ লাখ স্বেচ্ছাসেবীর উত্থান: বাস্তবতা না কি রণকৌশল?
গালিবাফের দাবি অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ইরানজুড়ে একটি শক্তিশালী জাতীয় আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এই আন্দোলনের ফলে প্রায় ৭০ লাখ ইরানি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সামরিক বাহিনীতে নাম লিখিয়েছেন। ৯ কোটি জনসংখ্যার দেশ ইরানে এটি একটি নজিরবিহীন পরিসংখ্যান।
যদিও এই বিশাল সংখ্যার উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) স্বেচ্ছাসেবী শাখা 'বাসিজ বাহিনী'র মাধ্যমে এই জনবল সংগ্রহ করা হচ্ছে। এমনকি ১২ বছর বয়সী শিশুদেরও এই বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। গালিবাফ বলেন, “আমরা আগেও আমাদের ভূমি রক্ষা করেছি, আবারও করতে প্রস্তুত। আমাদের ঘরে আক্রমণ করতে এলে পুরো জাতির মুখোমুখি হতে হবে।”
ট্রাম্পের ‘প্রস্তর যুগ’ বনাম ইরানের ‘বিধ্বংসী আঘাত’
এর আগে হোয়াইট হাউস থেকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দেন। ট্রাম্প দাবি করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া বিমান হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণের ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।
ট্রাম্প আমেরিকানদের আশ্বস্ত করে বলেন, “ইরানের কাছে খুব কম ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট আছে। আমরা আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে তাদের ওপর এমন চরম আঘাত হানব যে তারা ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরে যাবে।”
সংঘাতের পটভূমি: খামেনির মৃত্যু ও উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক হামলায় ইরান এক গভীর সংকটে পড়ে। ওই হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ এ পর্যন্ত ১ হাজার ৩৪০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এই ঘটনার পর থেকেই তেহরান প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইরান ইতিমধ্যে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্লেষণ: ৭০ লাখ বাহিনীর প্রভাব ও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ
(বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ)
ইরানের এই ‘৭০ লাখ স্বেচ্ছাসেবী’ ঘোষণার পেছনে বেশ কিছু সামরিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে:
১. মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare): ট্রাম্প যখন ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠানোর হুমকি দিচ্ছেন, তখন গালিবাফের এই ঘোষণা মূলত একটি পাল্টা মনস্তাত্ত্বিক চাপ। ইরান বিশ্বকে বোঝাতে চাচ্ছে যে, তারা কেবল নিয়মিত সেনাবাহিনী নয়, বরং পুরো জাতিকে নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে।
২. গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি: ৭০ লাখ মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার অর্থ হলো, ইরান সম্ভবত একটি দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধের (Guerilla Warfare) পরিকল্পনা করছে। যদি মার্কিন বাহিনী স্থল অভিযান শুরু করে, তবে এই বেসামরিক বাহিনী প্রতিটি শহর ও গ্রামকে দুর্ভেদ্য করে তুলবে।
৩. আঞ্চলিক অস্থিরতা: ইরানের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোকেও সংকটে ফেলছে। বিশেষ করে যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, তারা এখন ইরানের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
৪. ট্রাম্পের হিসেব নিকেশ: ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত দ্রুত একটি বিজয় চাচ্ছেন, যা তিনি আমেরিকান ভোটারদের দেখাতে পারেন। কিন্তু ইরান যদি সত্যিই ৭০ লাখ মানুষকে মাঠে নামাতে পারে, তবে এই সংঘাত ট্রাম্পের ভাবনার চেয়েও অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন