মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে নতুন করে রণহুঙ্কার দিল ইরান। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ সামরিক চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত একনাগাড়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তেহরান। গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সক্ষমতা ও কৌশল
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন, তাদের সামরিক বাহিনী কেবল স্বল্পমেয়াদী হামলা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই সামরিক অভিযান পরিচালনায় সক্ষম। তিনি বলেন, “আমরা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করছি না। ইরান নিজেকে রক্ষা করতে সংকল্পবদ্ধ এবং আমাদের কৌশলগত মজুদ ও সামরিক সক্ষমতা কয়েক মাস নয়, বরং কয়েক বছর পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো স্তরে রয়েছে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের এই দৃঢ় অবস্থান মূলত ইসরায়েলের সম্ভাব্য স্থল অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার হুমকির পাল্টা জবাব। আরাঘচির এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, তেহরান কেবল আত্মরক্ষা নয়, বরং শত্রুর শক্তি ক্ষয়ের (War of Attrition) কৌশল গ্রহণ করেছে।
ওয়াশিংটনের দাবি প্রত্যাখ্যান: আলোচনা না কি বার্তা বিনিময়?
সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, ইরানের সাথে তাদের পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে এবং তেহরান ওয়াশিংটনের দেওয়া কিছু কঠিন শর্ত মেনে নিয়েছে। এই দাবির কঠোর সমালোচনা করে আব্বাস আরাঘচি বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় ‘আলোচনা’ বা ‘Negotiation’ বলতে যা বোঝায়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তেমন কোনো পরিস্থিতি নেই।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, আলোচনা তখনই হয় যখন দুই দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি টেবিলে বসে চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। বর্তমানে যা চলছে তা কেবল ‘বার্তা আদান-প্রদান’ (Exchange of Messages)। ইরান কিছু সরাসরি বার্তা পাচ্ছে এবং কিছু বার্তা আঞ্চলিক বন্ধুদের মাধ্যমে (যেমন ওমান বা কাতার) ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ তাকে সরাসরি বার্তা পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন, তবে একে কোনোভাবেই ‘যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা’ বলা যায় না। এটি কেবল যোগাযোগের একটি মাধ্যম মাত্র।
আরও পড়ুনঃ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি? ইরানের পাশে রাশিয়ার দুর্ধর্ষ চেচেন বাহিনী, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ঘোষণা
হরমুজ প্রণালী ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথ ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালী সম্পর্কে আরাঘচি এক কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই জলসীমা ইরান ও ওমানের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের অংশ। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শত্রু দেশগুলোকে এই পথ কোনোভাবেই ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তবে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং নিরপেক্ষ দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ (Expert Opinion)
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের গভীরতা বিশ্লেষণ করলে তিনটি প্রধান দিক উঠে আসে:
১. প্রতিরক্ষা বলয়: ইরান তার ভূখণ্ডে যেকোনো স্থল অভিযানকে শত্রুর জন্য ‘মৃত্যুফাঁদ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাদের ড্রোন প্রযুক্তি এবং মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।
২. শর্তহীন যুদ্ধবিরতি নাকচ: তেহরান কেবল সাময়িক কোনো যুদ্ধবিরতিতে বিশ্বাসী নয়। তাদের দাবি হলো—পুরো অঞ্চলজুড়ে সংঘাতের স্থায়ী অবসান, যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি রোধের আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা এবং ক্ষয়ক্ষতির জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ।
৩. আঞ্চলিক নির্ভরতা: ইরান বারবার প্রতিবেশী দেশগুলোকে বিদেশি সামরিক ঘাঁটির ওপর নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে। আরাঘচির মতে, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা কেবল আঞ্চলিক দেশগুলোর সহযোগিতার মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হলেও আব্বাস আরাঘচি একে ‘কঠিন কিন্তু সম্ভব’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আগ্রাসী নীতি পরিবর্তন করতে হবে বলে তিনি শর্ত দিয়েছেন।
এদিকে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) ইরানের এই হুমকির পর তাদের সামরিক সতর্কবার্তা আরও জোরদার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল এই অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, নাকি এটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নেবে—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন