হাসপাতালগুলোতে চরম আতঙ্ক ও বাঙ্কার তৈরির হিড়িক
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ ভেদ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে আঘাত হানছে। বিশেষ করে হাইফা, জেরুজালেম এবং হাদেরার মতো বড় বড় শহরগুলোর হাসপাতালগুলো এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে। উত্তর ইসরায়েলের সর্ববৃহৎ চিকিৎসা কেন্দ্র রামবাম হেলথ কেয়ার ক্যাম্পাসে (Rambam) বর্তমানে কয়েক হাজার শয্যার একটি আন্ডারগ্রাউন্ড হাসপাতাল তৈরির কাজ চলছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের পার্কিং লটকে তিন তলা বিশিষ্ট একটি সুরক্ষিত বাঙ্কারে রূপান্তর করছে, যেখানে যুদ্ধকালীন সময়েও অস্ত্রোপচার এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (ICU) সচল রাখা সম্ভব হবে।
সরকারের বাজেট সংকট ও অনুদানের জন্য হাহাকার
ইসরায়েলি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’ জানিয়েছে, যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের টান পড়েছে। সামরিক খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের ফলে স্বাস্থ্য খাতের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে হাইফার রামবাম, জেরুজালেমের শারে জেদেক (Shaare Zedek) এবং হাদেরার হিলেল-ইয়াফে (Hillel-Yaffe) হাসপাতালগুলো এখন বিদেশ থেকে আসা অনুদানের দিকে তাকিয়ে আছে। হাসপাতালগুলোর আইটি সিস্টেম, অপারেশন থিয়েটার এবং অক্সিজেন সাপ্লাই ইউনিটগুলোকে মাটির নিচে সুরক্ষিত করার জন্য কোটি কোটি ডলার প্রয়োজন, যা সংগ্রহ করতে রীতিমতো আন্তর্জাতিক প্রচার চালাচ্ছে সরকার।
আরও পড়ুন: কয়েক সপ্তাহেই ইরান যুদ্ধ শেষ করতে চান ট্রাম্প
হরমুজ প্রণালি ও কৌশলগত চাপ
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান শুধুমাত্র আকাশপথেই নয়, বরং সমুদ্রপথেও ইসরায়েল এবং তার মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সাম্প্রতিক সার্বভৌমত্বের দাবি এবং তেলের ট্যাংকার চলাচলে কড়াকড়ি ইসরায়েলের জ্বালানি আমদানিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে দেশের ভেতরে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষ তৈরি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বদলে যাওয়া সমীকরণ
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এবারের হামলাগুলো ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
১. প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা: ইসরায়েল দীর্ঘকাল ধরে তাদের ‘আয়রন ডোম’ নিয়ে গর্ব করলেও, ইরানের শত শত ক্ষেপণাস্ত্রের একযোগে আক্রমণ (Swarm Attack) সামলাতে এটি হিমশিম খাচ্ছে।
২. মানবিক বিপর্যয়: হাসপাতালগুলোকে বাঙ্কারে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসরায়েল বর্তমানে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে বাঙ্কার তৈরির হিড়িক এবং সরকারের অনুদান ভিক্ষা করা দেশটির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।
৩. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: এই সংকটের সময়ে পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য ধীরে ধীরে প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
আগামী কয়েক সপ্তাহ এই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবের বিপরীতে ইরানের কঠোর শর্ত এবং ইসরায়েলের এই রক্ষণাত্মক অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সহসা শান্তির দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যদি পর্যাপ্ত অনুদান এবং বাঙ্কার দ্রুত প্রস্তুত না করা যায়, তবে আগামীতে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় এড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন