দীর্ঘ শুনানি ও জুরি বোর্ডের পর্যবেক্ষণ
নয় দিন ধরে চলা ম্যারাথন শুনানি এবং ৪০ ঘণ্টারও বেশি সময় আলোচনার পর এই রায় আসে। মামলার শুরু থেকে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলে আইনি লড়াই। জুরি বোর্ড তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো অ্যাপগুলোর নকশা (Design) করার ক্ষেত্রে মেটা ও গুগল চরম গাফিলতি দেখিয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর এই অ্যাপগুলোর সম্ভাব্য মানসিক প্রভাব সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের আগাম সতর্ক করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
ক্ষতিপূরণের বণ্টন ও মামলার প্রেক্ষাপট
রায়ে জুরি বোর্ড ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে ৪২ লাখ ডলার এবং ইউটিউবের মালিকানাধীন গুগলকে ১৮ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কেলি নামের ২০ বছর বয়সী এক তরুণী এই মামলাটি করেছিলেন। জুরি বোর্ড মামলার বাদী হিসেবে কেলিকে ৩ মিলিয়ন (৩০ লাখ) ডলার প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। কেলির অভিযোগ ছিল, তিনি মাত্র ৬ বছর বয়সে ইউটিউব এবং ৯ বছর বয়সে ইনস্টাগ্রামে আসক্ত হয়ে পড়েন, যা পরবর্তীতে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটায়।
কাঠগড়ায় জাকারবার্গ ও মোসেরি
এই মামলায় সাক্ষ্য দিতে সশরীরে হাজির হতে হয়েছিল মেটা’র সিইও মার্ক জাকারবার্গ এবং ইনস্টাগ্রাম প্রধান অ্যাডাম মোসেরিকে। শুনানির সময় জাকারবার্গকে কঠোর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ‘বিউটি ফিল্টার’ কেন নিষিদ্ধ করা হয়নি—এই প্রশ্নের জবাবে জাকারবার্গ বলেন, তিনি মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে জুরিরা তাঁর এই যুক্তি সরাসরি নাকচ করে দেন। উল্লেখ্য, ইউটিউবের সিইও নীল মোহনকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়নি।
রায়ের প্রতীকী গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বার্ষিক বিনিয়োগ করা এই দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে ৬০ লাখ ডলারের এই জরিমানা হয়তো নগণ্য, কিন্তু আইনি বিশ্লেষকদের মতে এর প্রতীকী গুরুত্ব অপরিসীম।
১. দায়বদ্ধতার নতুন নজির: সাধারণত মার্কিন আইন অনুযায়ী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের সাইটে আপলোড করা কনটেন্টের জন্য দায়ী থাকে না। কিন্তু এই মামলায় আইনজীবীরা ‘কনটেন্ট’ নয় বরং প্ল্যাটফর্মের ‘ডিজাইন’ বা কাঠামোগত ত্রুটির ওপর জোর দিয়েছেন, যা আদালত আমলে নিয়েছেন। এটি ভবিষ্যতে হাজারো মামলার পথ প্রশস্ত করবে।
২. ব্যবসায়িক মডেলে ধাক্কা: প্রযুক্তি বিশ্লেষক গিল লুরিয়া মনে করেন, এই রায়ের পর মেটা ও গুগল তাদের অ্যাপের অ্যালগরিদম ও নকশায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হতে পারে। এটি তাদের ব্যবহারকারী বৃদ্ধির হার বা ‘এঙ্গেজমেন্ট’ কমিয়ে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
৩. ফেডারেল আইনের চাপ: ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি অঙ্গরাজ্য শিশুদের আসক্তি কমাতে আইন করেছে। এই রায়ের পর বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ফেডারেল পর্যায়ের কঠোর আইন করার চাপ আরও বাড়বে।
আপিলের ঘোষণা ও সমঝোতা
মেটা ও গুগল অবশ্য এই রায় মেনে নেয়নি। উভয় প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্ররা জানিয়েছেন, তাঁরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। অন্যদিকে, একই ধরনের অভিযোগে স্ন্যাপচ্যাট ও টিকটকের বিরুদ্ধেও মামলা ছিল, তবে বিচার শুরুর আগেই তারা বাদীর সঙ্গে আদালতের বাইরে একটি অপ্রকাশিত মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা করে নিয়েছে।
বাদীর প্রধান আইনজীবী এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘আজকের এই রায় পুরো প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি কড়া বার্তা। এখন থেকে আর দায় এড়িয়ে চলা যাবে না। জবাবদিহির সময় চলে এসেছে।’

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন