দ্রুত সমাধানের লক্ষ্য ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টাদের স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি এই যুদ্ধকে কয়েক বছরের দীর্ঘস্থায়ী জাঁতাকলে পরিণত করতে চান না। হোয়াইট হাউসের সূত্র অনুযায়ী, ট্রাম্প বিশ্বাস করেন সংঘাতটি দ্রুত মিটে গেলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনের সমীকরণ মাথায় রেখে তিনি একটি ‘দ্রুত বিজয়’ (Quick Victory) নিশ্চিত করতে মরিয়া।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব
যুদ্ধের ময়দানে হামলা চললেও পর্দার আড়ালে চলছে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা। ওয়াশিংটন বর্তমানে পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় তেহরানের কাছে ১৫ দফার একটি আনুষ্ঠানিক শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরান বর্তমানে একটি চুক্তির জন্য কার্যত "মিনতি" (Begging) করছে। যদিও তেহরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে "একপাক্ষিক ও অযৌক্তিক" বলে অভিহিত করেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে একটি কূটনৈতিক "অফ-র্যাম্প" বা সংঘাত থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে।
মানবিক কারণে হামলা স্থগিতের ঘোষণা
একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপে ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার সময়সীমা আগামী ১০ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন। ৬ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে। জানা গেছে, ইরানের বিশেষ অনুরোধ এবং চলমান শান্তি আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই বিরতিকে ট্রাম্প তাঁর মহানুভবতা হিসেবে প্রচার করছেন।
হরমুজ প্রণালি ও তেলের বাজার
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কেন্দ্রে থাকা হরমুজ প্রণালি নিয়েও কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান আলোচনার সদিচ্ছা হিসেবে ওই প্রণালি দিয়ে ১০টি তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, কারণ তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিতে পারে।
কঠোর হুঁশিয়ারি: "সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন"
দ্রুত সমাধান চাইলেও ট্রাম্পের ভাষায় কোনো নমনীয়তা নেই। তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, যদি তারা এই শান্তি চুক্তিতে সায় না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের জন্য "সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন" (Worst Nightmare) হয়ে দাঁড়াবে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরান সম্পূর্ণ পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ট্রাম্পের কৌশলের ব্যবচ্ছেদ
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী নীতি—একদিকে আলোচনার প্রস্তাব আর অন্যদিকে ভয়াবহ হামলার হুমকি—মূলত ইরানকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করার একটি কৌশল।
১. সময়ক্ষেপণ না সমাধান? ট্রাম্প ৪-৬ সপ্তাহের যে সময়সীমা দিয়েছেন, তা মূলত তাঁর ভোটারদের আশ্বস্ত করার জন্য। তবে ইরানের মতো একটি দেশ এত অল্প সময়ে সব শর্ত মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
২. পাকিস্তানের ভূমিকা: এই সংকটে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়া দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে দেশটির গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
৩. তেল রাজনীতি: ট্রাম্পের মূল ভয় তেলের দাম নিয়ে। হরমুজ প্রণালি সচল রাখা তাঁর জন্য সামরিক বিজয়ের চেয়েও বড় অর্থনৈতিক বিজয়।
সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, তাসনিম নিউজ, আল আরাবিয়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন