সত্যকথা ডেস্ক
কূটনৈতিক তৎপরতা ও ইরানের জবাব
প্রতিবেদনে তেহরানের এই জবাবের বিষয়ে অবগত একটি উচ্চপদস্থ সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বুধবার (২৫ মার্চ) রাতে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। দীর্ঘ এক মাস ধরে চলা এই সংঘাত নিরসনে ওয়াশিংটন সম্প্রতি ১৫ দফার একটি রূপরেখা পেশ করেছিল, যার প্রেক্ষিতে ইরান এই প্রতিক্রিয়া জানাল।
ইরানের প্রধান শর্তসমূহ
তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাত অবসানে ইরান বেশ কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, যেকোনো শান্তি চুক্তির আগে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে:
১. গুপ্তহত্যা ও আগ্রাসন বন্ধ: ইরান তাদের ভাষায় ‘গুপ্তহত্যা ও আগ্রাসন’ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। একই সাথে ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ও নিশ্চিত গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে।
২. যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ: এক মাসের যুদ্ধে ইরানের অবকাঠামো এবং সাধারণ জনগণের যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য সুনির্দিষ্ট ও নিশ্চিত ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে তেহরান। ইরান চায়, এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ এবং প্রদানের প্রক্রিয়া চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
৩. একযোগে যুদ্ধবিরতি: ইরান আহ্বান জানিয়েছে, এই সংঘাতের সঙ্গে জড়িত ওই অঞ্চলের সবকটি ফ্রন্টে বা রণক্ষেত্রে একযোগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে। এর অর্থ হলো, শুধুমাত্র সরাসরি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নয়, বরং ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক ও লেবাননে সক্রিয় ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চলা অভিযানও বন্ধ করতে হবে।
৪. হরমুজ প্রণালিতে সার্বভৌমত্ব: ইরানি ওই সূত্র বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বকে একটি ‘স্বাভাবিক ও আইনগত অধিকার’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে হবে। বিশ্ব খনিজ তেল বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ স্বীকার করে নেওয়াকে তেহরান সমঝোতার অন্যতম চাবিকাঠি হিসেবে দেখছে।
জেনেভা আলোচনার ধারাবাহিকতা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে জেনেভায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরান যেসব দাবি জানিয়েছিল, বর্তমান সব শর্তের সঙ্গে সেগুলোও যুক্ত হবে। অর্থাৎ, ইরান তাদের পূর্বের অবস্থান থেকে সরে আসেনি, বরং নতুন পরিস্থিতি বিবেচনায় শর্তের তালিকা আরও দীর্ঘ করেছে।
ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য নিয়ে তেহরানের সংশয়
ইরানের আনুষ্ঠানিক জবাব পাঠানো হলেও, তেহরানের ওই সূত্র যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছে। ইরান মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের এই আলোচনার আহ্বান মূলত এক ধরনের ‘প্রতারণা’, যার পেছনে একাধিক কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে।
ইরানের মতে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি মূল লক্ষ্য:
১. বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা।২. সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যাতে খুব বেশি বেড়ে না যায়, তা নিয়ন্ত্রণ করা। ৩. দক্ষিণ ইরানে বড় ধরনের স্থল অভিযানের জন্য সময়ক্ষেপণ করে নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করা।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মেরুকরণ?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা ইরানের এই জবাবকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ইরান এই শর্তগুলোর মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তারা কোনো চাপে পড়ে সমঝোতা করবে না। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির সার্বভৌমত্বের দাবি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের (Proxy groups) একযোগে যুদ্ধবিরতির আওতায় আনার দাবি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হবে।
যদি যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ স্বীকার করে নেয়, তবে তা হবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির বড় ধরনের পরাজয়। অন্যদিকে, তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং স্থল যুদ্ধের ভয়াবহতা এড়াতে ওয়াশিংটন হয়তো কিছু শর্তে নমনীয় হতে পারে। তবে, ইরান যে সংশয় প্রকাশ করেছে—এটি সামরিক প্রস্তুতির জন্য সময়ক্ষেপণ কি না—তা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আগামী কয়েক দিন তেহরান ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক চালাচালি এবং যুদ্ধের ময়দানের পরিস্থিতিই ঠিক করবে মধ্যপ্রাচ্য শান্তির পথে এগোবে নাকি আরও বড় সংঘাতের দিকে।
সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি, আল আরাবিয়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন