আন্তর্জাতিক ডেস্ক । বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| সংঘাতের আশঙ্কায় কৌশলগত সমুদ্রসীমায় সামরিক যুদ্ধজাহাজের কঠোর টহল।প্রতীকী ছবি। |
স্বল্পস্থায়ী কিন্তু অত্যন্ত তীব্র যুদ্ধের আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরান এবার আর আগের মতো দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষামূলক কৌশলে হাঁটবে না। বার্লিনভিত্তিক নামী চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স’–এর ইরানবিষয়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজি এ বিষয়ে একটি চাঞ্চল্যকর বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, চলতি বছরের প্রথম দফার যুদ্ধে ইরানিরা প্রায় তিন মাসের একটি দীর্ঘস্থায়ী ও নিয়ন্ত্রিত সংঘাতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখছিল। সে সময় প্রতিপক্ষের বড় কোনো আগ্রাসন ঠেকাতে এবং নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ধরে রাখতে তারা বেশ সংযত প্রতিক্রিয়া দেখায়।
তবে এবার যদি কোনোভাবে যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তবে পরিস্থিতি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজিজি বলেন, ইরানি সামরিক কমান্ডারদের ধারণা—এবারের লড়াইটি হবে ‘স্বল্পস্থায়ী কিন্তু অত্যন্ত তীব্র’। ওয়াশিংটন এবার সরাসরি ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড অর্থাৎ তাদের তেলক্ষেত্র ও জ্বালানি অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্য করে সমন্বিত ও ভারী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে। আর এই আশঙ্কায় তেহরানও তাদের রণকৌশল পুরোপুরি বদলে ফেলেছে।
বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত করার ইরানি ব্লু-প্রিন্ট
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন করে যেকোনো লড়াই শুরু হওয়া মাত্রই ইরান প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দিতে প্রতিদিন কয়েক ডজন থেকে শুরু করে কয়েক শ ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য হবে আমেরিকার যুদ্ধংদেহী হিসাব-নিকাশ মুহূর্তের মধ্যে ওলটপালট করে দেওয়া। আর এই পাল্টা আঘাতের প্রথম লক্ষ্যবস্তু হতে যাচ্ছে পারস্য উপসাগরীয় মার্কিন মিত্র আরব দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনা।
উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলক্ষেত্র, বিশাল শোধনাগার এবং কৌশলগত বন্দরগুলোয় নিখুঁত ও ভারী আঘাত হানা হলো বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ধাক্কায় বিপর্যস্ত করার জন্য তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী টেকনিক্যাল কার্ড। একই সাথে এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর ঘরোয়াভাবে তীব্র চাপ সৃষ্টি করারও মোক্ষম উপায়। যদি ইরানি হামলায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কুয়েতের তেল উৎপাদন ব্যবস্থা বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা পুরো বিশ্বকে এক ধাক্কায় বড় মন্দার দিকে ঠেলে দেবে।
আমিরাতকে ‘উটের যুগে’ ফিরিয়ে নেওয়ার হুঁশিয়ারি
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সরকারি ঘনিষ্ঠ মহল ও নিরাপত্তা বাহিনীর থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (UAE) নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও আমিরাতবিরোধী কঠোর বক্তব্য লক্ষ্য করা গেছে। তেহরানের প্রকাশ্য অভিযোগ, আমিরাত তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও বিমান উড্ডয়নের স্থাপনাগুলো পরিচালনার সুযোগ দিয়ে ইরানের ওপর বিগত হামলাগুলোয় পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছে। শুধু তাই নয়, কিছু আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও প্রকাশ পেয়েছে যে, পূর্ববর্তী মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ইরানকে লক্ষ্য করে গোপনে তথ্য আদান-প্রদান বা সামরিক সহায়তা দিয়েছিল।
এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং প্রভাবশালী বিশ্লেষক মেহেদি খারাতিয়ান গত মাসে এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় বলেন, "আমেরিকার মদদে আমাদের ওপর আঙুল তুললে অবশ্যই আমিরাতকে আবার সেই প্রাচীন উটে চড়ার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং আমরা তা করার পূর্ণ সক্ষমতা রাখি। প্রয়োজন হলে আমরা আবুধাবিও দখল করব।" যদিও পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা এই বক্তব্যকে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ বা অতিরঞ্জিত বলে মনে করছেন, তবুও ‘আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউট’-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক আলি আলফোনেহ বলেন, এই বক্তব্যগুলো যতই উগ্র শোনাক না কেন, এগুলো ইরানের ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) শীর্ষ নেতৃত্বের ভেতরের মূল রণকৌশল ও চিন্তাভাবনাকেই নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত করে।
দুই সামুদ্রিক ফ্রন্টে ওয়াশিংটনকে ব্যস্ত রাখার কৌশল
বিশ্ব বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে ইরান এবার একসঙ্গে দুটি সামুদ্রিক ফ্রন্টকে সচল করার ছক কষছে। গত দফার লড়াইয়ে ইরানিরা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালী’র কাছাকাছি অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছিল। তবে এবার তেহরান লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা সংকীর্ণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘বাব আল–মান্দেব প্রণালি’র ওপরও পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে।
উল্লেখ্য, এই বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১০ ভাগের ১ ভাগ পরিবাহিত হয়, যা বর্তমানে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের পাশেই অবস্থিত। বিশ্লেষক মেহেদি খারাতিয়ান স্পষ্ট করে বলেছেন, মার্কিন প্রশাসন যদি ইরানের অর্থনৈতিক বা তেল অবকাঠামোতে আঘাত হানে, তবে ইরান হুথিদের সহায়তায় বাব আল-মান্দেবে পশ্চিমা জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ সীমিত বা অবরুদ্ধ করে এর পাল্টা জবাব দেবে। এটি করা হলে যুক্তরাষ্ট্রকে একসাথে দুটি ভিন্ন ও দূরবর্তী সামুদ্রিক ফ্রন্টে মনোযোগ দিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে। তবে এই সমীকরণটি শেষ পর্যন্ত বেশ জটিল রূপ নিতে পারে। কারণ, হুথিরা মুখে ইরানকে রক্ষার অঙ্গীকার করলেও তাদের নিজেদের সীমিত সামরিক মজুত ও ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতার কথা চিন্তা করে আগের লড়াইয়ে বেশ সাবধানে পা ফেলেছিল।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'হামলা স্থগিতের' ঘোষণাটি কোনো স্থায়ী শান্তির বার্তা নয়, বরং এটি বড় কোনো সামরিক অভিযানের আগে শক্তি সঞ্চয় ও কূটনৈতিক দরকষাকষির একটি সাময়িক কৌশল মাত্র। ওয়াশিংটন ও তেহরান বর্তমানে যে লাইফ সাপোর্টে থাকা যুদ্ধবিরতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা যেকোনো মুহূর্তে একটি মাত্র ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের স্ফুলিঙ্গে দাউদাউ করে জ্বলে উঠতে পারে।
ইরানি থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর পক্ষ থেকে আরব আমিরাতকে ‘উটের যুগে’ ফিরিয়ে নেওয়া বা আবুধাবি দখলের হুমকি মূলত উপসাগরীয় দেশগুলোকে মার্কিন জোট থেকে দূরে রাখার একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ। তবে এই কৌশল ব্যাকফায়ার করার ঝুঁকিও প্রবল। কারণ, সৌদি আরব বা আমিরাতের তেলক্ষেত্রে আঘাত এলে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ফাটল তৈরি হবে, যা আল্টিমেটলি ইসরায়েলের ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেই সফল করবে। তাছাড়া হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালী অবরুদ্ধ হলে তার মাশুল কেবল আমেরিকাকে নয়, বাংলাদেশসহ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকেও দিতে হবে। বিশ্ব শান্তির স্বার্থে ও জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় পাকিস্তানের মতো নিরপেক্ষ প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যস্থতায় একটি স্থায়ী অনাক্রমণ চুক্তি বা 'নন-অ্যাগ্রেশন প্যাক্ট' গঠন করাই এই মুহূর্তে একমাত্র যৌক্তিক সমাধান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন