ধর্ম ডেস্ক । বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে হাটে কোরবানির পশু নির্বাচন করছেন ক্রেতারা। (বিডি নিউজ সত্যকথা) |
পশুভেদে অংশীদারের সীমা ও সহিহ হাদিসের নির্দেশনা
ইসলামি শরিয়তের সুস্পষ্ট বিধান অনুযায়ী, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা জাতীয় ছোট পশু দিয়ে কেবল একজন ব্যক্তিই কোরবানি দিতে পারবেন। এ ধরনের পশুতে একাধিক ব্যক্তি শরিক বা অংশীদার হলে কারও কোরবানি সহিহ হবে না। অন্যদিকে বড় পশু অর্থাৎ উট, গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি শরিক হতে পারবেন। সাতের অধিক অংশীদার হলে কোনো শরিকেরই কোরবানি শুদ্ধ হবে না।
এ বিষয়ে ইসলামের অন্যতম প্রধান কিতাব সহিহ মুসলিম শরিফে (হাদিস নং: ১৩১৮) হজরত জাবের (রা.) থেকে একটি প্রসিদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, "আমরা রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে হজের ইহরাম বেঁধে রওনা হলাম। অতঃপর তিনি উট ও গরুতে আমাদের মধ্যে সাতজন করে শরিক হওয়ার (কোরবানি করার) নির্দেশ দিলেন।"
ইসলামি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩০৪) ও বাদায়েউস সানায়ে (৫/৭০) অনুযায়ী, বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাত ভাগ করা যেমন জায়েজ, তেমনি সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা—যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ বা ছয় ভাগে কোরবানি করাও সম্পূর্ণ জায়েজ। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, শরিকে কোরবানির ক্ষেত্রে প্রত্যেক অংশীদারের অংশ বা আর্থিক অবদান ন্যূনতম এক-সপ্তমাংশ (১/৭) হতে হবে। যদি কোনো একজনের অংশ এর চেয়ে কম হয় (যেমন আট আনা বা কোনো ভগ্নাংশ), তাহলে পুরো পশুর সব শরিকের কোরবানিই অশুদ্ধ হয়ে যাবে।
এক ভাগে দুই ভাই: শায়খ আহমাদুল্লাহর ফতোয়া ও সমাধান
অনেকে মনে করেন, একটি গরুর সাত ভাগের যেকোনো এক ভাগের টাকা দুই ভাই মিলে বা স্বামী-স্ত্রী মিলে পরিশোধ করে কোরবানি দিতে পারবেন। এ বিষয়ে বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় ইসলামি আলোচক ও আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ শরিয়তের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি ফিকহি কিতাব ‘আদদুররুল মুহতার’ (৯/৪৫৭) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, "কুরবানির পশুতে সাত ভাগের এক ভাগের টাকা যদি দুই ভাই বা একাধিক ব্যক্তি মিলে দেন, তবে সেই কুরবানি সহিহ হবে না। কারণ এখানে সাত ভাগের একটি নির্দিষ্ট অংশের ভেতর আবারও একাধিক ব্যক্তি শরিক হয়ে যাচ্ছেন, যা শরিয়তে নিষিদ্ধ।"
তবে এর একটি বৈধ সুরত বা সমাধানও তিনি বাতলে দিয়েছেন। শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, যদি যৌথ টাকা দিয়ে এক ভাগ নিতেই হয়, তবে তাদের একজন অপরজনকে তার ভাগের টাকাটি হেবা বা উপহার হিসেবে দিয়ে সম্পূর্ণ মালিক বানিয়ে দেবেন। অতঃপর সেই একক ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে কোরবানি নিয়ত করবেন। তাহলে কোরবানিটি ইসলামি বিধিমোতাবেক সম্পূর্ণ সহিহ ও বিশুদ্ধ হবে।
ধনী ও গরিবের পশু কেনার নিয়তের ভিন্নতা
কোরবানির পশু ক্রয়ের ক্ষেত্রে ধনী (যাঁর ওপর কোরবানি ওয়াজিব) এবং গরিবের (যাঁর ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়) বিধানে কিছু তফাত রয়েছে। কোনো ধনী ব্যক্তি যদি প্রথমে একা কোরবানি দেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি গরু বা মহিষ কেনেন, পরবর্তীতে তিনি চাইলে অন্যকে শরিক করতে পারবেন। এটি জায়েজ হলেও একা কোরবানি দেওয়াই তার জন্য উত্তম। আর যদি কাউকে শরিক করেন, তবে শরিক করা অংশের প্রাপ্ত টাকা নিজে ভোগ না করে আল্লাহর ওয়াস্তে সদকা করে দেওয়া উত্তম।
বিপরীতে, কোনো গরিব ব্যক্তি যদি একা কোরবানির নিয়তে কোনো পশু কিনে ফেলেন, তবে ক্রয়ের মাধ্যমে ওই পশুটি সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে নির্ধারিত হয়ে যায়। তাই পরে তিনি আর কাউকে এতে শরিক করতে পারবেন না। যদি করেন, তবে শরিকের কাছ থেকে নেওয়া পুরো অর্থ গরিব-দুঃখীদের মাঝে সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব বা আবশ্যক। গরিব ব্যক্তি যদি ভাগে কোরবানি দিতে চান, তবে তাকে পশু কেনার আগেই অংশীদারদের ঠিক করে নিতে হবে। (হেদায়া: ৪/৪৪৩)
গোশত বণ্টন ও নিয়তের বিশুদ্ধতা
শরিকে কোরবানি করার পর মাংস বা গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে অনেকেই বড় ভুল করে থাকেন। ইসলামি ফিকহের নির্দেশনা অনুযায়ী, শরিকি কোরবানির মাংস অবশ্যই নিখুঁতভাবে ডিজিটাল বা সাধারণ পাল্লায় ওজন করে সমান ভাগে বণ্টন করতে হবে। চোখের দেখায় বা অনুমান করে (আন্দাজে) ভাগ করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ। কম-বেশি হলে তা সুদের আওতায় পড়তে পারে, যা কোরবানির সওয়াব নষ্ট করে দেয়। বণ্টনকৃত মাংসের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) গরিব-মিসকিনকে এবং এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের দেওয়া উত্তম; বাকি অংশ নিজেরা রাখতে পারেন।
সবচেয়ে মোক্ষম বিষয় হলো নিয়ত। অংশীদারদের কেউ যদি আল্লাহর হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কোরবানি না করে, শুধু ফ্রিজ ভর্তি করা বা লোকদেখানো মাংস খাওয়ার নিয়তে শরিক হন; তবে তার কারণে ওই পশুর বাকি ছয়জন খাঁটি নিয়তকারীর কোরবানিও মাটি হয়ে যাবে। তাই শরিকে কোরবানি দেওয়ার আগে অংশীজনদের উপার্জনের উৎস হালাল কিনা এবং তাদের নিয়ত বিশুদ্ধ কিনা, তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই করা প্রতিটি মুসল্লির দায়িত্ব।
অনলাইনে শরিকি কোরবানি: ফিকহি দৃষ্টিকোণ ও সতর্কতা
আধুনিক নগরজীবনে কর্মব্যস্ততা, পশু কেনা, লালন-পালন ও কসাইয়ের ঝামেলার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘অনলাইনে শরিকি কোরবানি’ বা ‘ডিজিটাল কোরবানি’র ট্রেন্ড বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ডেইরি ফার্ম ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট প্যাকেজের বিনিময়ে গরুর শেয়ার বিক্রি, কোরবানি সম্পন্ন করা এবং প্রসেসড মাংস বাসায় পৌঁছে দেওয়ার সেবা দিচ্ছে।
হাদিসের আলোকে (জামে তিরমিযী: ১৫০১), অন্যের দ্বারা বা ওকালতের মাধ্যমে কোরবানি করানো মূলত জায়েজ। তাই অনলাইনে টাকা দিয়ে বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোরবানি করানো ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ। কিন্তু বাস্তবতার বিচারে আলেম সমাজ একে ‘অনুত্তম’ বা ত্রুটিযুক্ত বলে মনে করছেন। কারণ অনলাইন ব্যবস্থায় বড় কিছু শরয়ি জটিলতা থাকে:
১. অজ্ঞাত শরিক ও অর্থ: অনলাইনে যারা একটি গরুর বিভিন্ন শেয়ার কিনছেন, তারা একে অপরকে চেনেন না। কার অর্থ হালাল আর কার অর্থ হারাম—তা জানার কোনো সুযোগ থাকে না। একজনের হারাম উপার্জনের কারণে পুরো কোরবানি বাতিল হতে পারে।
২. মালিকানা হস্তান্তর (কবয): অনেক প্রতিষ্ঠান আগেই পশু কিনে পরে গ্রাহকের কাছে ডিজিটাল ছবি দেখিয়ে অংশ বিক্রি করে। শরীয়া অনুযায়ী, পশু ক্রয়ের সময় ক্রেতা বা তার নিযুক্ত প্রতিনিধির (ওকালত) মানসিক উপস্থিতি ও মালিকানা হস্তান্তরের শর্তগুলো অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট থেকে যায়।
৩. ত্যাগের অনুভূতি: কোরবানি কোনো মাংস হোম-ডেলিভারি নেওয়ার বাণিজ্যিক চুক্তি নয়। পশু কেনার আনন্দ, আল্লাহর নামে নিজ হাতে বা সামনে দাঁড়িয়ে জবাই করা এবং ত্যাগের যে আধ্যাত্মিক রূহ বা অনুভূতি, তা অনলাইন সার্ভিসে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকে।
তাই বিশেষ কোনো বাধ্যবাধকতা বা প্রবাসে থাকার মতো জটিলতা না থাকলে, পরিচিত ও দ্বীনদার আত্মীয় বা প্রতিবেশীদের সাথে সরাসরি হালাল টাকায় শরিকে কোরবানি করাই সর্বোত্তম ও নিরাপদ মাধ্যম।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, কোরবানি কেবল একটি বাৎসরিক সামাজিক প্রথা নয়, এটি সরাসরি ইসলামের একটি অন্যতম বুনিয়াদি ইবাদত বা ‘শেয়ার’। তাই এর প্রতিটি পদক্ষেপ সুনির্দিষ্ট ফিকহি কানুনের ফ্রেমে বাঁধা। ভাগে কোরবানি দেওয়ার সময় আমরা অনেকেই রক্তের সম্পর্ক বা সামাজিক খাতিরকে প্রাধান্য দিই, কিন্তু অপর শরিকের উপার্জনের স্বচ্ছতা ও নিয়তকে আমল দিই না, যা একটি মারাত্মক ভুল।
অনলাইন কোরবানির যে আধুনিক বাজার গড়ে উঠেছে, তা শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় স্বস্তি দিলেও ইসলামিক শরীয়া বোর্ডগুলোর উচিত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কড়া নজরদারি রাখা। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে শতভাগ শরীয়া কমপ্লায়েন্স বা হালাল সার্টিফিকেট নিশ্চিত করে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষের কষ্টের টাকায় করা ইবাদতটি কেবলই মাংস খাওয়ার উৎসবে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। সামর্থ্য অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিখুঁত উপায়ে আল্লাহকে খুশি করাই হোক এবারের কোরবানির মূল লক্ষ্য।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের সাময়িক পিছুটান, মধ্যপ্রাচ্যকে ‘উটের যুগে’ ফেরানোর প্রচ্ছন্ন হুমকি ইরানের
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন