![]() |
| দেশে শিশু ও নারী নির্যাতন বন্ধ এবং কঠোর সুরক্ষার দাবিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ। প্রতীকী ছবি। |
ইউনিসেফের তীব্র ক্ষোভ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি অবসান
বিবৃতিতে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স উল্লেখ করেন, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশজুড়ে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন ও পাশবিক সহিংসতা বৃদ্ধির খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা ইউনিসেফকে গভীরভাবে মর্মাহত, স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি বলেন, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি দেশব্যাপী শিশু এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর আইনি ও সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে সবার সামনে এনেছে।
অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, বাংলাদেশে অপরাধীদের ক্ষেত্রে যে দীর্ঘদিনের ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ (Culture of Impunity) চলে আসছে, তার অবসান ঘটাতে হবে। একই সাথে তিনি প্রতিরোধ ব্যবস্থা, দ্রুত অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ বা সহিংসতা রিপোর্টিং, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, শিশু-বান্ধব পুলিশিং ও বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক সেবা খাতের মারাত্মক ঘাটতিগুলো দ্রুত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সমাধানের তাগিদ দেন।
সহিংসতা ছড়ায় সমাজের নীরবতায়: ১০৯৮-এ রিপোর্টের আহ্বান
ইউনিসেফ প্রতিনিধি সমাজকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, "সহিংসতা তখনই ডালপালা মেলে এবং জ্যামিতিক হারে ছড়ায়, যখন সমাজ বা চারপাশের মানুষ নীরব থাকে।" তাই কোনো এলাকায় শিশু বা নারীর ওপর সহিংসতা, নির্যাতন, নিগ্রহ বা শোষণের ঘটনা ঘটলে তা লোকলজ্জা বা ভয়ের কারণে চেপে না রেখে তাৎক্ষণিকভাবে শিশু হেল্পলাইন ‘১০৯৮’ (Child Helpline 1098)-সহ অন্যান্য সরকারি সুরক্ষা সেবার মাধ্যমে রিপোর্ট বা অভিযোগ করার জন্য ইউনিসেফ আক্রান্ত পরিবার ও সচেতন নাগরিকদের প্রতি জোর আহ্বান জানাচ্ছে।
এর পাশাপাশি রানা ফ্লাওয়ার্স ভুক্তভোগী নারী ও শিশুদের জন্য মানসিক ও সামাজিক (Psychosocial Support) সহায়তা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র, পাড়া-মহল্লা এবং কেয়ার সেন্টারগুলোর জবাবদিহিতা ও নজরদারি আগের চেয়ে আরও বহু গুণ বাড়ানোর তাগিদ দেন।
ভুক্তভোগীর ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা ‘পুনর্নির্যাতন’
বিবৃতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, তা হলো ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা। ইউনিসেফ কঠোরভাবে সতর্ক করে জানিয়েছে যে, নির্যাতনের শিকার বা নিহত শিশুদের ছবি, ভিডিও বা পরিচয় প্রকাশ করা এক ধরণের বড় অপরাধ এবং এটি ভুক্তভোগীর ওপর ‘পুনর্নির্যাতন’ (Re-victimization)-এর শামিল।
যারা না বুঝে বা সস্তা হুজুগে এই ধরণের ছবি ও সংবেদনশীল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক) শেয়ার বা রি-শেয়ার করছেন, তারা মূলত ভুক্তভোগী এবং তাদের স্বজনদের মানসিক ট্রমা ও কষ্টকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তাই সাধারণ জনগণ, গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের প্রতি ভুক্তভোগীদের মৌলিক অধিকারের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান জানানোর এবং এই ধরণের ছবি বা ভিডিও ছড়ানো থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সাড়ে চার মাসে ১১৮ শিশু ধর্ষণ: মানবাধিকারের করুণ দশা
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সরবরাহকৃত পরিসংখ্যান দেশের শিশু সুরক্ষার কঙ্কালসার চিত্রটি সামনে এনেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১১৮ জন শিশু সরাসরি ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে আরও অন্তত ৪৬টি শিশু। একই সময়ে ধর্ষণের পর অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে ১৭টি নিষ্পাপ শিশুকে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম আতিকুর রহমান বলেন, "উন্নত বিশ্বে যাদের এ ধরনের বিকৃত ও পাশবিক মানসিকতা থাকে, তাদের মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিকভাবে পুরোপুরি চিহ্নিত (Socially Tagged) করে রাখা হয়, যাতে সবাই সতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে তা হয় না। উল্টো শিশুরা এক চরম অনিরাপদ ও থমথমে পরিবেশে বড় হচ্ছে।"
তিনি আরও আক্ষেপ করে বলেন, "আমাদের দেশে মানুষের মৃত্যু যেন এখন খুব সহজ ও সস্তা একটি বিষয় হয়ে গেছে। যেকোনো অপরাধের পর ‘কোনো ব্যাপার না’ বা পার পেয়ে যাওয়ার যে মানসিকতা সমাজে ঢুকে গেছে, তার কারণে অপরাধপ্রবণ মানুষের কাছে নতুন অপরাধ করাটা অনেক সহজ হয়ে পড়েছে।"
রাজনৈতিক এজেন্ডায় অনুপস্থিত শিশু সুরক্ষা: কমিশন গঠনের দাবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর উদাসীনতা ও জবাবদিহিতার অভাবকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, "যদি দেশে একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন ‘চাইল্ড প্রটেকশন কমিশন’ (Child Protection Commission) গঠন করা হয়, যারা প্রাথমিক শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশু সুরক্ষায় সরাসরি কাজ করবে এবং শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করবে, তাহলেই কেবল পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মূল রাজনৈতিক এজেন্ডায় কখনোই যথাযথ গুরুত্ব পায় না।"
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বছরের শুরুতে ইউনিসেফের শিশু অধিকার ইশতেহারে দেশের প্রধান ১২টি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর বাস্তব মাঠে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সচেতনতা ও চিন্তায় শিশু সুরক্ষাকে কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছে, তা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞদের মনে যথেষ্ট সন্দেহ ও গভীর সংশয় রয়েছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, একটি দেশের শিশুরা যখন তাদের নিজেদের ঘর, বিদ্যালয়, খেলার মাঠ বা মাদ্রাসায় নিরাপদ থাকতে পারে না, তখন সেই সমাজ বা রাষ্ট্রের সামগ্রিক নৈতিকতার ভিত কতটা নড়বড়ে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকারকে সর্বোচ্চ গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এই বিচারহীনতার চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
শুধু ট্রাইব্যুনাল গঠন বা আইনের ধারা বাড়িয়ে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়। ধর্ষণের পর হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, অবিলম্বে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে তাদের দলের অভ্যন্তরীণ ইশতেহার ও স্থানীয় কর্মসূচিতে শিশু সুরক্ষার বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ধর্ষকদের কেবল আইনি শাস্তিই নয়, সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ বয়কট ও চিহ্নিত করতে হবে। একই সাথে ইউনিসেফের বার্তার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে আমরা বলতে চাই, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুক্তভোগী শিশুর ছবি বা ভিডিও শেয়ার করে ভিউ পাওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, তা বন্ধে সাইবার পুলিশকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে না পারলে আমাদের সমস্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি অর্থহীন হয়ে পড়বে।
আরও পড়ুন: আসন্ন ঈদুল আজহা ও শরিকে কোরবানি: কোন নিয়মে কোরবানি সহিহ হবে?
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন