সত্যকথা রিপোর্ট
![]() |
চাঁদপুরে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত। |
ডিজিটাল বোতাম টিপেই ১৫ হাজার নারীর অ্যাকাউন্টে নগদ অর্থ
অনুষ্ঠানের অন্যতম মূল আকর্ষণ ছিল আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের কাছে সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী সমাবেশমঞ্চে বসে ল্যাপটপের ডিজিটাল বাটন টিপতেই চাঁদপুরসহ দেশের মোট ২১টি জেলার সুবিধাভোগী ১৫ হাজার নারীর প্রত্যেকের নিজস্ব মোবাইল অ্যাকাউন্টে তাৎক্ষণিকভাবে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ অর্থ চলে যায়।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী প্রতীকীভাবে হাসিনা খাতুন, সোহাগী আখতার, ফাতেমা খাতুন, আমেনা খাতুন, মোসেদা বেগম, মনোয়ারা বেগম, মাহমুদা খাতুন, রুমা আখতার, নাজমা বেগম এবং তাসলিমা—এই ১০ জন ভাগ্যবতী নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন। কার্ড পাওয়া সুবিধাভোগীদের পক্ষে রুমা আখতার ও মনোয়ারা বেগম মঞ্চে দাঁড়িয়ে অনুভূতি প্রকাশ করেন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এই যুগান্তকারী উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান।
বিএনপির রাজনীতি মানেই উৎপাদন ও উন্নয়ন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তৃতায় দলের রাজনৈতিক দর্শন ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "বিএনপি দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের রাজনীতি করে। বিএনপির রাজনীতি মানেই হলো দেশজুড়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া খাল খনন করে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি করা, নতুন নতুন মিল-কারখানা তৈরি করে যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি নাগরিকের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া।"
তিনি আরও বলেন, "বিএনপি যে সকল কর্মসূচি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার প্রত্যেকটি হচ্ছে এ দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলের স্বার্থে। এই লক্ষ্য নিয়েই আমরা রাজপথে দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে দেশ থেকে স্বৈরাচারী শাসন হটিয়েছি। দেশের সর্বস্তরের মানুষ এখন একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দেশের শাসনক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। তাই এখন আমাদের মূল দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের মুখে হাসি ফোটানো ও ভাগ্যের সত্যিকারের পরিবর্তন আনা।"
'করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ'
চাঁদপুরের ঐতিহাসিক এই জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী দেশ গড়ার এক নতুন স্লোগান ও শপথের ডাক দেন। তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, "এখন আর আন্দোলনের সময় নয়, এখন সময় কাজ করার, এখন সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়ার। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে দেশ গড়ার কাজে নেমে পড়ি।"
তিনি উপস্থিত জনতাকে হাত তুলে প্রতিজ্ঞা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আসুন আমরা আজ এই শর্তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই—'করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ'। এই জনসভায় আমাদের আজ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে, যাতে আমাদের এই অগ্রযাত্রার পথে কেউ কোনো বাধা সৃষ্টি করতে না পারে। এ জন্য দেশের প্রতিটি কোণায় সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।"
চাঁদপুরের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক ঘোষণা
জনসভায় স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও চাঁদপুরের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হয়। এর মধ্যে চাঁদপুরে একটি আধুনিক ইপিজেড (EPZ) স্থাপন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি অন্যতম। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে চাঁদপুরের এই অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়ন চাহিদার প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দৃঢ় আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, "১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে আমরা দেশের মানুষকে যে সকল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, দেশের মানুষ ভোটের মাধ্যমে তার পক্ষে রায় দিয়েছে। আমরা জনগণের সেই রায় ও বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করতে কাজ শুরু করেছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে সকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে এবং চাঁদপুরকে একটি আধুনিক ও শিল্পসমৃদ্ধ জেলা হিসেবে গড়ে তোলা হবে।"
মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশাল সমাবেশে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য প্রদান করেন শিক্ষামন্ত্রী আনম এহছানুল হক মিলন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী উপদেষ্টা মাহদী আমিন, চাঁদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, চাঁদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জালাল আহমেদ, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রাশেদ বেগম হীরা, চাঁদপুরের জেলা পরিষদের প্রশাসক সলিম উল্যা সেলিম এবং সমাজকল্যাণ সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ।
এছাড়া অনুষ্ঠানে ভিআইপি অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী) সহ সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ। সভার শুরুতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, জাতীয় সঙ্গীত এবং দলীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, চাঁদপুর থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একযোগে ২১টি জেলায় ফ্যামিলি কার্ড ও সরাসরি ডিজিটাল মাধ্যমে নগদ অর্থ পৌঁছানোর এই কর্মসূচি বর্তমান নির্বাচিত সরকারের একটি যুগান্তকারী কল্যাণমুখী পদক্ষেপ। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এই আড়াই হাজার টাকা সাময়িকভাবে হলেও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি সুবিধাভোগীর কাছে টাকা চলে যাওয়ার ডিজিটাল প্রক্রিয়াটি দুর্নীতি রোধে প্রশংসনীয়।
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্বৈরাচার পতনের পর নির্বাচিত সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে যে 'বিভ্রান্তি' ও 'অরাজকতা'র উল্লেখ করেছেন, তা দূর করতে হলে কেবল রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে চাঁদপুরে ইপিজেড ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের যে আশ্বাস তিনি দিয়েছেন, তা যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থেকে দ্রুত আলোর মুখ দেখে, সেটাই চাঁদপুরবাসীর পাশাপাশি বিডি নিউজ সত্যকথার প্রত্যাশা।
আরও পড়ুন: বাজেটে ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের পরিকল্পনা
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন