আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| ট্রাম্পের ইরান চুক্তি শর্ত। প্রতীকী ছবি। |
ট্রাম্পের চার শর্ত ও ‘বি-২ বোমারু’ বিমান হামলা প্রসঙ্গ
টানটান উত্তেজনার পারদ কিছুটা নামিয়ে আনার ইঙ্গিত দিলেও ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া ট্রাম্পের শর্ত অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই শান্তিচুক্তি কার্যকর করতে হলে ইরানকে বেশ কিছু কঠোর ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ট্রাম্পের খসড়া চুক্তির প্রধান চারটি শর্ত হলো:
১. স্থায়ী পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা: ইরানকে এই শর্তে সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ীভাবে একমত হতে হবে যে তারা কখনোই কোনো ধরনের পারমাণবিক বা পরমাণু অস্ত্র তৈরি কিংবা সংগ্রহ করবে না।
২. শুল্কমুক্ত হরমুজ প্রণালি: বিশ্বের জ্বালানি বাজারের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত 'হরমুজ প্রণালি' কোনো ধরনের শুল্ক বা টোল আদায় ছাড়াই উভয়মুখী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তরীর অবাধ ও নিরাপদ যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে হবে।
৩. মাইন অপসারণের দায়: এই নৌপথে যদি কোনো সামুদ্রিক মাইন বা বিস্ফোরক বাকি থেকে থাকে, তবে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইরানকেই সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করতে হবে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন নৌবাহিনী ইতোমধ্যে সেখানে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে অনেক মাইন সফলভাবে ধ্বংস করেছে।
৪. সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস: ট্রাম্প একটি বড় ধরনের দাবি করে বলেন, প্রায় ১১ মাস আগে মার্কিন অত্যাধুনিক বি-২ বোমারু বিমান নিখুঁত হামলা চালিয়ে ইরানের যে ভূগর্ভস্থ খনি বা বাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, সেখান থেকে সমস্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করে আনা হবে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সেই ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর বার্তায় স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান যদি এই শর্তগুলো মেনে নিয়ে চুক্তিতে সই করে, তবে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের কড়া নৌ-অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেবে। এর ফলে বর্তমানে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটকে থাকা শত শত পণ্যবাহী ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কোনো বাধা ছাড়াই তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
‘সত্য ও মিথ্যার অদ্ভুত মিশ্রণ’: তেহরানের তীব্র পাল্টা জবাব
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দীর্ঘ পোস্ট ও শর্তের তালিকা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করলেও এর পরপরই তীব্র ও মারমুখী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা 'ফার্স নিউজ' এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া এই বক্তব্য মূলত ‘সত্য ও মিথ্যার এক অদ্ভুত মিশ্রণ’ এবং ট্রাম্পের এই একপেশে দাবি ইরান সম্পূর্ণভাবে ও জোরালোভাবে নাকচ করে দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানের বেশ কিছু উচ্চপদস্থ ও কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ফার্স নিউজ দাবি করেছে, ট্রাম্প মূল খসড়া চুক্তির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধারা সম্পূর্ণ বিকৃত ও ভুলভাবে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করেছেন, যাতে তিনি আন্তর্জাতিক মহলে নিজের একটি ‘ভুয়া বিজয়’ বা ক্রেডিট জাহির করতে পারেন।
ইরানি কূটনৈতিক সূত্রগুলোর স্পষ্ট দাবি, ইরানের নিজস্ব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার ও মার্কিন সহায়তায় তা ধ্বংস করার বিষয়ে ট্রাম্প যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, কাল্পনিক এবং বাস্তবতাবিবর্জিত। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের টোল ছাড়া আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের যে শর্তের কথা ট্রাম্প বলছেন, তেমন কোনো বিষয়ও মূল খসড়া চুক্তির কোথাও উল্লেখ বা আলোচনা হয়নি।
তেহরানের মূল অভিযোগ হলো, ট্রাম্প অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে আসল সংকটগুলো এড়িয়ে গেছেন। মার্কিন প্রশাসনের কাছে অন্যায় ও অবৈধভাবে আটকে থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ দ্রুত মুক্ত করে দেওয়া এবং লেবাননে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল শর্তগুলো ট্রাম্প তাঁর পোস্টে সম্পূর্ণ চেপে গেছেন।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই 'ট্রুথ সোশ্যাল কূটনীতি' আসলে বিশ্বমঞ্চে মার্কিন আধিপত্যের এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক প্রচার বৈ আর কিছু নয়। ট্রাম্প এমন একটি সময় এই পোস্টটি করেছেন যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা চলছে এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজার থমথমে।
প্রশাসনিকভাবে বিচার করলে, ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার ঘোষণাটি ইতিবাচক মনে হলেও, ট্রাম্পের শর্তগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর একপেশে নীতি। ওয়ান-সাইডেড বা একপেশেভাবে চুক্তি প্রকাশ করে ট্রাম্প মূলত মার্কিন ভোটার ও বৈশ্বিক মিত্রদের দেখাতে চান যে তিনি ইরানকে নতজানু করতে পেরেছেন। কিন্তু ইরানের বিলিয়ন ডলারের ফান্ড আটকে রাখা এবং লেবানন সংকটের মতো মূল বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়ে কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি সম্ভব নয়। ইরান যদি পুরোপুরি এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষকেই যদি একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে হয়, তবে একপেশে ক্রেডিট নেওয়ার রাজনীতি বন্ধ করে বাস্তবসম্মত ও সমতার ভিত্তিতে আলোচনা টেবিলে বসতে হবে।
আরও পড়ুন: ভারতে ‘নামাজের ওপর নজরদারি’: উত্তর প্রদেশে ঈদের আগে আতঙ্কে মুসলিমরা
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন