সত্যকথা রিপোর্ট
আট দিনব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি ও নয়াপল্টনে শোকের আবহ
শহীদ রাষ্ট্রপতির ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি গত ২৫ মে থেকে আগামী ১ জুন পর্যন্ত দেশজুড়ে আট দিনব্যাপী বিশেষ ও বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ২৫ মে থেকেই সারা দেশে বিশেষ স্মরণিকা ও পোস্টার প্রকাশ করা হচ্ছে এবং দলীয় নেতাকর্মীরা গভীর শোকের প্রতীক হিসেবে কালো ব্যাজ ধারণ করছেন। এছাড়া দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন সংবাদপত্র ও অনলাইন পোর্টালে এই মহান রাষ্ট্রনায়কের কর্মময় জীবনের ওপর বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়েছে।
আজ ৩০ মে শনিবার ভোর ৬টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের সব স্তরের দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং একই সঙ্গে উত্তোলন করা হয় কালো পতাকা। সকাল থেকেই নয়াপল্টন ও এর আশপাশের এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে এক আবেগঘন ও শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
জিয়া উদ্যানে লাখো মানুষের ঢল: শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
আজকের কর্মসূচির মূল আকর্ষণ ছিল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে অবস্থিত শহীদ রাষ্ট্রপতির মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন ও জিয়ারত। সকাল ১১টার দিকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মরহুম নেতার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই জিয়া উদ্যান, বিজয় সরণি, ফার্মগেট ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপচে পড়া ভিড় ও ব্যাপক সমাগম দেখা যায়। বিজয় সরণি থেকে জিয়া উদ্যান পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কের দুই পাশে অবস্থান নেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মী। তাদের হাতে ছিল শহীদ জিয়ার ছবি সংবলিত ব্যানার, ফেস্টুন এবং দলীয় ও কালো পতাকা। নেতাকর্মীদের বিভিন্ন আবেগঘন স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, কৃষক দল ও শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা সুশৃঙ্খলভাবে সংগঠনের ব্যানার নিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নেন। পুরো এলাকায় একদিকে যেমন ছিল এক আবেগঘন পরিবেশ, অন্যদিকে ছিল প্রশাসনের কড়া ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ফাতিহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাতে শহীদ রাষ্ট্রপতির রুহের মাগফিরাত কামনা এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি প্রার্থনা করা হয়। মাজার প্রাঙ্গণে জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের উদ্যোগে একটি বিশেষ দোয়া মাহফিলও অনুষ্ঠিত হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিলুন হকসহ দল ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
মাজার জিয়ারত শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের টি অ্যান্ড টি খেলার মাঠ সংলগ্ন এলাকায় যান। সেখানে তিনি স্বয়ং উপস্থিত থেকে সমাজের অসচ্ছল, গরিব ও দুস্থ মানুষের মাঝে কাপড়, চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও বস্ত্র বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এছাড়া দিনের বাকি সময় ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত আরও কয়েকটি সামাজিক ও মানবিক কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। একইভাবে দেশের সব জেলা, মহানগর ও তৃণমূল ইউনিটে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল এবং দুস্থদের মাঝে খাবার ও বস্ত্র বিতরণ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরদিন ৩১ মে রোববার বেলা ২টায় রাজধানীর রমনায় ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে এক কেন্দ্রীয় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বাণী: "জনগণের মণিকোঠায় চিরজাগরূক থাকবেন শহীদ জিয়া"
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার রহমানের ৪৫তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশেষ বাণী দিয়েছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বাণীতে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, "শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাদাসিধে নির্মোহ জীবন, বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, প্রশ্নাতীত সততা এবং একজন বাস্তববাদী ও কর্মোদ্যমী রাষ্ট্রনায়কের স্বরূপ জনগণের মণিকোঠায় চিরজাগরূক থাকবে।" তিনি আশা প্রকাশ করেন, শহীদ জিয়ার কর্মময় জীবন, অগাধ দেশপ্রেম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর নীতি, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায় অটলতা, স্বনির্ভর উন্নয়ন ভাবনা ও জীবন আদর্শ নতুন প্রজন্মের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে আরও উল্লেখ করেন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের এই বীর সেনানায়ক, স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক এবং আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে জিয়ার অসামান্য অবদান জাতি সর্বদা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁর সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান সমগ্র জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যার কারণে তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বাক-ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের চেতনায় গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। তাঁর ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল একটি উৎপাদনমুখী ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ও সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকীটি সমসাময়িক বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন বার্তা বহন করছে। দীর্ঘ দেড় দশক পর জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছে এবং তাঁরই সন্তান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এটি কেবল একটি দলীয় সাফল্য নয়, বরং জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ও ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের’ প্রতি আমজনতার গভীর আস্থার এক ঐতিহাসিক প্রতিফলন।
জিয়াউর রহমান এমন এক সময়ে বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়েছিলেন যখন দেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, দুর্ভিক্ষপীড়িত এবং একদলীয় শাসনের বেড়াজালে বন্দি। তিনি খালের পানি সেচ, গণশিক্ষা, সবুজ বিপ্লব এবং স্বনির্ভর ১৯ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে এদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব প্রাণসঞ্চার করেছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি বাঙালিকে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ে একটি নিজস্ব ভৌগোলিক ও মনস্তাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি এনে দিয়েছিলেন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো শহীদ জিয়ার সেই ‘প্রশ্নাতীত সততা’ ও ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর নীতি’ শাসনব্যবস্থায় শতভাগ ফিরিয়ে আনা। ক্ষমতার দাপটে যেন জিয়ার সেই ‘সাদাসিধে নির্মোহ জীবনের’ আদর্শ হারিয়ে না যায়, সেদিকে নতুন প্রজন্ম ও বর্তমান শাসকদলকে সচেষ্ট থাকতে হবে। তবেই তাঁর শাহাদাতবার্ষিকী পালন প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে।
আরও পড়ুন: ওয়াশিংটন-ইরান সম্ভাব্য চুক্তির নেপথ্যে সত্য-মিথ্যার খেলা
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন