আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
মালিয়ানার রক্তাক্ত ইতিহাস ও বর্তমানের ‘অন্য পথ’-এর হুমকি
মসজিদ পরিচালনা কমিটির এক প্রবীণ সদস্য উপস্থিত সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলছিলেন, "অনুগ্রহ করে কেউ মসজিদের গেটের বাইরে বা রাস্তায় কাতার সোজা করবেন না। ভেতরে জায়গা না হলে পরের শিফটের নামাজের জন্য অপেক্ষা করুন। কোনো অবস্থাতেই কারও সঙ্গে তর্কে জড়াবেন না, ভিডিও করবেন না এবং কোনো উসকানিতে পা দেবেন না।" উপস্থিত মুসল্লিরা নীরবে মাথা নেড়ে সেই নির্দেশনা মেনে নেন। কারণ মালিয়ানার মুসলিমদের অতীত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত বেদনাকায়ক ও রক্তাক্ত। ১৯৮৭ সালের মে মাসে এই গ্রামেই স্থানীয় হিন্দু দাঙ্গাবাজ এবং উত্তর প্রদেশ রাজ্য সরকারের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ‘প্রাদেশিক আর্মড কনস্ট্যাবুলারি’ (পিএসি)-এর সদস্যদের যৌথ তাণ্ডবে ৭২ জন মুসলিম নির্মমভাবে গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর ২০২৩ সালে ভারতের একটি আদালত প্রমাণের অভাবে সব আসামিকে খালাস দেয়। কিন্তু এবারের আতঙ্ক সেই পুরোনো ক্ষত নিয়ে নয়, বরং বর্তমান প্রশাসনের আইনি ও সামাজিক খাঁড়া নিয়ে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি ভারতে ক্ষমতায় আসার পর থেকে কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো অনেক বেশি প্রশ্রয় পেয়েছে। গত এক দশকে তারা ট্রাফিক জ্যাম ও জননিরাপত্তার অজুহাত তুলে মুসলিমদের জুমার নামাজ ও ঈদের মতো বড় ধর্মীয় উৎসবে খোলা জায়গায় বা রাস্তায় নামাজ পড়ার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করেছে। সম্প্রতি বিজেপির আদর্শিক মিত্র ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ (ভিএইচপি) দেশজুড়ে রাস্তার ওপর নামাজ পড়ার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি তুলেছে এবং একে মুসলিমদের "শক্তি প্রদর্শন" বলে আখ্যা দিয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করেছেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তথা কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা যোগী আদিত্যনাথ। গত ১৮ মে তিনি নিজের ভেরিফাইড সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে (পূর্বের টুইটার) একটি পোস্টে সরাসরি হুমকি দিয়ে লিখেছেন, মুসলিমদের ঈদের নামাজ ‘শিফটে’ বা দফায় দফায় আদায় করতে হবে। তিনি আরও লেখেন, ‘ভালোবাসায় মানলে ভালো, না মানলে অন্য পথ অবলম্বন করা হবে...।’
বুলডোজার কালচার ও ‘অপমানের’ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
মুখ্যমন্ত্রীর এই ‘অন্য পথ’ বা হুমকির প্রকৃত অর্থ কী, তা উত্তর প্রদেশের মুসলিমদের ভালো করেই জানা আছে। মিরাটের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল জাজিরাকে বলেন, "গত বছর খোলা জায়গায় বা মসজিদের বারান্দা পেরিয়ে রাস্তায় নামাজ পড়ার অপরাধে শত শত সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দেওয়া হয়েছিল। কিছু এলাকায় মানুষের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি যারা নামাজে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন আটকে বা বাতিল করার ঘটনাও ঘটেছে। এসব দেখার পর মানুষ স্বাভাবিকভাবেই চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।"
নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে আলীগড় জেলার একজন দোকানদার আরিফ মালিক জানান, গত বছরের ঈদুল আজহায় তাঁর এলাকার মুসলমানরা একটি খোলা মাঠে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য নামাজ পড়েছিলেন, কিন্তু নামাজ শেষ হতেই পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে মুসল্লিদের তাড়া করে। তিনি বলেন, "এবার পরিবারের প্রবীণরা তরূণদের যেকোনো ধরনের ভিড় বা প্রকাশ্য জমায়েত এড়িয়ে চলার কঠোর পরামর্শ দিচ্ছেন।"
আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নোমান খান বলেন, "এখানে এখন একটি চরম অবমাননা ও অপমানের ভয় কাজ করে। শারীরিকভাবে কোনো ক্ষতি না হলেও, মানুষ ভয় পায় যে প্রকাশ্য স্থানে নামাজ পড়ার সময় কোনো ডানপন্থী উগ্রবাদী যুবক তাদের ভিডিও রেকর্ড করে অনলাইনে ট্রোল করবে বা কোনো মিথ্যা অভিযোগে পুলিশে ফাঁসিয়ে দেবে। অভিভাবকরা এখন যুবকদের মসজিদের বাইরে বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতেও বারণ করছেন, কারণ কেউ কোনো আইনি ঝামেলা চায় না।"
উধাও ঈদের আনন্দ, নজরদারিতে কোরবানিও
এই ভয় ও বিধিনিষেধ উৎসবের দিনগুলোতে মুসলিম সম্প্রদায়ের চিরাচরিত আচরণে সূক্ষ্ম কিন্তু স্পষ্ট পরিবর্তন এনেছে। পশ্চিম উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার একজন ইমাম অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, "আমরা এখন ঈদের তাৎপর্য ও ধর্মীয় আলোচনা নিয়ে সময় কাটানোর চেয়ে কীভাবে প্রশাসনের বিধিনিষেধ ও মামলা এড়ানো যায়, সেই কৌশল নিয়ে বেশি সময় নষ্ট করি। বিতর্ক এড়ানোই এখন আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।"
রাজ্যের রাজধানী লখনউয়ের আরেকজন ইমাম বলেন, "জায়গার সংকটের কারণে ঈদের মূল জামায়াত স্বাভাবিকভাবেই সামান্য সময়ের জন্য পাশের রাস্তায় গিয়ে পৌঁছায়, এটি কোনো আইন অমান্যের জেদ থেকে করা হয় না। নামাজ মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য হয় এবং এর পরপরই রাস্তা খুলে দেওয়া হয়। আগে এটাকে কখনোই বড় কোনো সমস্যা মনে করা হতো না। কিন্তু এখন এটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন মুসলমানরা ইচ্ছাকৃতভাবে জনসাধারণের জায়গা দখল করার চেষ্টা করছে।"
এই উদ্বেগ শুধু উত্তর প্রদেশেই সীমাবদ্ধ নেই; দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য এলাকায়ও একই ধরনের অঘোষিত নির্দেশনা জারি রয়েছে। পুরোনো দিল্লির ঐতিহাসিক জামে মসজিদের আশপাশের কাপড় ব্যবসায়ী দানিশ খান বলেন, "মানুষ শুধু শান্তিতে নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরতে চায়। কিন্তু এখন প্রতিটি ঈদ আসার আগেই এক অজানা আশঙ্কা তৈরি হয় যে প্রশাসন আবার কোনো নতুন নিয়ম জারি করে কি না।"
শুধু নামাজই নয়, এবার ঈদুল আজহার প্রধান অনুসঙ্গ পশুকোর্বানির ওপরও প্রশাসন কড়া নজরদারি ও কঠোর নিয়ম আরোপ করেছে। কোরবানির পশুর রক্ত বা বর্জ্য যদি ভুলবশতও পাবলিক ড্রেন বা রাস্তায় যায়, তবে তার জন্য কঠোর আইনি জরিমানা ও মামলার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ভারতীয় টেলিভিশন টকশো এবং সামাজিক মাধ্যমে মুসলিমদের হিজাব পরা, হালাল খাবার খাওয়া কিংবা লাউডস্পিকারে আজান দেওয়া নিয়ে একের পর এক তৈরি হওয়া বিতর্ক মুসলিম সম্প্রদায়ের মনের ভেতর এক দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। নয়ডার একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ফয়সান আলী বলেন, "আপনার মনে হতে শুরু করবে যে আপনার পরিচয়ের সাথে যুক্ত প্রতিটি জিনিসই এখন প্রশ্নের মুখে।"
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, ভারতের এই 'নামাজ বিতর্ক' ও প্রকাশ্য ইবাদতের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আসলে জনশৃঙ্খলার কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং এটি সমসাময়িক ভারতের জনপরিসরে মুসলিমদের দৃশ্যমানতা এবং তাদের নাগরিক অধিকারকে ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করার এক পরিকল্পিত রাজনৈতিক এজেন্ডা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং জনসাধারণের সুবিধার দোহাই দেওয়া হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে চরম দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট। ভারতের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যখন অন্য প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিশাল ধর্মীয় মিছিল, কাওয়ার যাত্রা বা উৎসবের জন্য দিনের পর দিন রাস্তা বন্ধ করে দেয়, রুট পরিবর্তন করে এবং সরকারি অর্থ ও অবকাঠামো দিয়ে সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করে, তখন মাত্র ১০ মিনিটের ঈদের নামাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং তার বিপরীতে বুলডোজার বা পাসপোর্ট বাতিলের মতো কঠোর শাস্তির খড়গ ঝুলানো আইনের স্পষ্ট পক্ষপাতমূলক ও বৈষম্যমূলক প্রয়োগ। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের ধারা ২৫ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র যখন একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে ধারাবাহিকভাবে কঠোর নজরদারির মধ্যে ফেলে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের অনুভূতি দেয়, তখন তা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। ভারতের নীতিনির্ধারকদের উচিত ভীতিমুক্ত পরিবেশে সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা।
আরও পড়ুন: আকর্ষণীয় ডিজাইন ও দুর্দান্ত সাউন্ডের মেলবন্ধন: বাজারে এলো 'Nothing Headphone (1)'
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন