আন্তর্জাতিক ডেস্ক । বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
শুভেন্দু অধিকারীর শপথের মধ্য দিয়ে বাংলায় বিজেপি যুগের সূচনা এবং মমতার ডিজিটাল মাধ্যমে পরাজয় স্বীকারের ইঙ্গিত। |
শপথ গ্রহণ: ব্রিগেড থেকে রাজভবন
শনিবার (৯ মে) বেলা ১১টার দিকে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, নিশীথ প্রামাণিকসহ আরও পাঁচজন হেভিওয়েট নেতা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, "আজ বাংলায় প্রকৃত উন্নয়ন ও সুশাসনের সূর্যোদয় হলো।"
শুভেন্দু অধিকারী, যিনি একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী ছিলেন, আজ তিনিই তাঁর সিংহাসন দখল করলেন। ভবানীপুর আসনে মমতাকে পরাজিত করার পর শুভেন্দুর এই উত্থান ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মমতার ‘এক্স’ হ্যান্ডেল ও ডিজিটাল আত্মসমর্পণ
ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করে আসছিলেন যে, এই জয় ‘জনগণের ম্যান্ডেট নয়, বরং বড় ষড়যন্ত্র’। তিনি পদত্যাগ করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু শনিবার সকালে তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এর প্রোফাইলে এক চাঞ্চল্যকর পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
মমতা তাঁর বায়ো থেকে ‘Honorable Chief Minister’ শব্দটি সরিয়ে লিখেছেন— “Founder Chairperson, All India Trinamool Congress. Chief Minister of West Bengal (15th, 16th and 17th Vidhan Sabha)”। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি ‘সাবেক’ বা ‘প্রাক্তন’ শব্দ ব্যবহার না করলেও, নিজের সময়কাল নির্দিষ্ট করে দিয়ে তিনি পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছেন যে ১৮তম বিধানসভায় তিনি আর ক্ষমতায় নেই। তবে ‘প্রাক্তন’ শব্দটি এড়িয়ে তিনি এখনো তাঁর লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন।
কালীঘাটে রবীন্দ্রজয়ন্তী ও ঐক্যের ডাক
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুর শপথ গ্রহণের দিনটিতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কালীঘাটে রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তোলেন। মমতা বলেন, “রাজ্যে এখন সন্ত্রাস ও দমননীতির পরিবেশ। আমাদের কর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে, এমনকি আমার পরিবারকেও রেহাই দেওয়া হচ্ছে না।”
এই অনুষ্ঠান থেকেই তিনি বিজেপি-বিরোধী বৃহত্তর ঐক্যের ডাক দেন। বাম, অতিবাম, কংগ্রেস এবং সমস্ত অরাজনৈতিক সংগঠনকে একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “এখন বিভাজনের নয়, ঐক্যের সময়। আমরা লড়ব এবং ফিরব।” যদিও সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম এই আহ্বানকে কটাক্ষ করে বলেছেন, “রথ দেখা আর কলা বেচা একই সঙ্গে হয় না।”
শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল কংগ্রেসের হাত ধরে। পরে তৃণমূলের হয়ে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রধান সংগঠক হিসেবে তিনি নজর কাড়েন। ২০২০ সালে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন মমতা-অভিষেক জুটির প্রধান সমালোচক।
বিজেপির এই জয়ের পেছনে শুভেন্দুর ‘মেরুকরণ’ এবং ‘দুর্নীতিবিরোধী’ প্রচার বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে প্রশাসক হিসেবে শুভেন্দুর সামনে পাহাড়প্রমাণ চ্যালেঞ্জ। একদিকে ভেঙে পড়া শিল্প পরিকাঠামো পুনর্গঠন, অন্যদিকে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা—শুভেন্দু অধিকারীর ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচনী পরিসংখ্যান এক নজরে
এবারের নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে (একটিতে ভোট স্থগিত) বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন। তৃণমূল কংগ্রেস আটকে গেছে ৮০টিতে। ভোট শতাংশের নিরিখে বিজেপি ৪৫.৮৪% এবং তৃণমূল ৪০.৮০% ভোট পেয়েছে। এই বিশাল ব্যবধানই প্রমাণ করে যে বাংলার মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
পশ্চিমবঙ্গের এই ক্ষমতার পালাবদলকে বিডি নিউজ সত্যকথা তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করছে:
১. ব্যক্তিত্বের সংঘাত বনাম সাংগঠনিক শক্তি: এবারের লড়াই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা বনাম বিজেপির সুসংগঠিত ক্যাডার বাহিনীর। শেষ পর্যন্ত মমতার একক লড়াই হার মেনেছে বিজেপির সর্বভারতীয় সাংগঠনিক শক্তির কাছে।
২. শুভেন্দুর নতুন পরিচয়: শুভেন্দু অধিকারী এখন আর শুধু একজন ‘দলত্যাগী’ নেতা নন, তিনি এখন বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ওপর আরএসএস এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অগাধ ভরসা রয়েছে। তবে বাংলার মতো জটিল রাজ্যে শাসন পরিচালনা করা তাঁর জন্য ‘বেড অব রোজেস’ হবে না।
৩. তৃণমূলের অস্তিত্ব রক্ষা: ৮০টি আসন নিয়ে তৃণমূল এখন বিরোধী দলের আসনে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখন তাঁর দলের ঘর গোছাতে হবে। দলের অভ্যন্তরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। মমতার ‘ডিজিটাল আত্মসমর্পণ’ আসলে একটি কৌশলগত পিছু হঠা, যেখান থেকে তিনি নতুন করে লড়াই শুরু করতে চান।
আরও পড়ুন: ফেসবুক ক্রিয়েটরদের জন্য দুঃসংবাদ, বিপাকে সংবাদ ও বিনোদন পেজগুলো
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন