প্রযুক্তি ডেস্ক। বিডি নিউজ সত্যকথা
দীর্ঘদিন ধরে ফেসবুকের নিউজফিডে আমরা বিভিন্ন তথ্যবহুল ফটোকার্ড দেখে আসছি। অনেক বড় বড় সংবাদ মাধ্যম থেকে শুরু করে শখের ক্রিয়েটররা এই ফটোকার্ডের মাধ্যমে ভালো আয় করতেন। কিন্তু মেটা কর্তৃপক্ষ এখন তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে আমূল পরিবর্তন এনেছে। ফেসবুকের অভ্যন্তরীণ সূত্র এবং ডিজিটাল বিশেষজ্ঞদের মতে, মেটা এখন আর স্থির চিত্র বা ফটোর পেছনে টাকা খরচ করতে চাইছে না। তাদের সম্পূর্ণ নজর এখন ভিডিও—বিশেষ করে ‘রিলস’ এবং ‘শর্ট ভিডিও’ কনটেন্টের ওপর।
ফেসবুকের নতুন ‘কনটেন্ট মনিটাইজেশন সিস্টেম’ (Content Monetization System) প্রবর্তনের পর থেকে দেখা যাচ্ছে, একই পরিমাণ ভিউ বা এনগেজমেন্ট থাকলেও ফটোকার্ডের বিপরীতে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্রিয়েটরদের দাবি, আগে যেখানে একটি ফটোকার্ড ভাইরাল হলে কয়েকশ ডলার আয় হতো, এখন সেখানে আয়ের পরিমাণ দশভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যারা
এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে নিউজ পোর্টাল, বিনোদনমূলক পেজ এবং ভাইরাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর। যারা মূলত সংবাদের চুম্বক অংশ বা মজার কোনো উদ্ধৃতি দিয়ে ফটোকার্ড তৈরি করতেন, তাদের পেজের এনগেজমেন্ট ঠিক থাকলেও আয়ের গ্রাফ নিচের দিকে নামছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেসবুকের অ্যালগরিদম এখন এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা ভিডিও কনটেন্টকে নিউজফিডের একদম ওপরের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে ফটোকার্ডের ইমপ্রেশন কমছে এবং বিজ্ঞাপনদাতারাও স্থির চিত্রের চেয়ে ভিডিওর পাশে তাদের বিজ্ঞাপন দিতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। এতে করে বিজ্ঞাপনের বিডিং রেট (CPM) ফটোকার্ডের জন্য অত্যন্ত কমে গেছে।
ভিডিও ও রিলস: ফেসবুকের নতুন সোনার খনি
মেটা এখন টিকটক এবং ইউটিউব শর্টসের সাথে পাল্লা দিতে মরিয়া। সে কারণেই তারা রিলস ক্রিয়েটরদের জন্য বিশেষ বোনাস এবং উচ্চ আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। ডিজিটাল কনটেন্ট বিশেষজ্ঞ সাইফুর রহমান জানান, “ফেসবুক এখন একটি ভিডিও প্ল্যাটফর্ম হতে চায়। তারা চায় ব্যবহারকারীরা স্ক্রল করার সময় দীর্ঘক্ষণ ভিডিওতে আটকে থাকুক। স্থির চিত্রে ব্যবহারকারীকে বেশিক্ষণ আটকে রাখা সম্ভব হয় না বলেই মেটা ফটোকার্ডের মনিটাইজেশন সীমিত করে আনছে।”
অনেকে জানিয়েছেন, তাদের ভিডিও মনিটাইজেশন ঠিক থাকলেও ফটোকার্ডের মনিটাইজেশন অনেক ক্ষেত্রে ‘রেড’ বা ‘ইয়েলো’ ডলার সাইন হয়ে যাচ্ছে অথবা খুব নগণ্য আয় দেখাচ্ছে।
ক্রিয়েটরদের জন্য এখন করণীয় কী?
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিজিটাল ক্রিয়েটরদের টিকে থাকতে হলে কৌশলী হতে হবে। বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন:
১. ভিডিওতে গুরুত্ব দেওয়া: শুধু ফটোকার্ডের ওপর নির্ভর না করে প্রতি সপ্তাহে অন্তত কয়েকটি মানসম্মত ভিডিও বা রিলস আপলোড করতে হবে।
২. মাল্টি-প্ল্যাটফর্ম স্ট্র্যাটেজি: শুধু ফেসবুকে সীমাবদ্ধ না থেকে ইউটিউব শর্টস বা ইন্সটাগ্রামের সাথে কনটেন্ট সমন্বয় করতে হবে।
৩. ইন্টারেক্টিভ কনটেন্ট: ফটোকার্ডের পরিবর্তে পোল, প্রশ্নোত্তর বা লাইভ সেশনের মাধ্যমে দর্শকদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
ফেসবুক কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করেছে, তারা ক্রিয়েটরদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে নতুন ও বৈচিত্র্যময় আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু সেই সুযোগ যে ভিডিও নির্ভর হবে, তা এখন দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
ফেসবুকের এই সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে বিডি নিউজ সত্যকথা একটি বৃহত্তর বিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখছে:
১. মনোপলি ও ভিডিওর জয়: ফেসবুক বুঝতে পেরেছে যে ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ ভিডিওর হাতে। তাই তারা তাদের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন আয়ের উৎস ‘ফটোকার্ড’ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এটি মূলত ক্রিয়েটরদের বাধ্য করছে ভিডিও তৈরিতে। যারা প্রযুক্তি বা ট্রেন্ডের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে না, তারা এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়বে।
২. আয়ের অনিশ্চয়তা: ফেসবুক বা মেটার ওপর একক নির্ভরতা সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। আজকের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে প্ল্যাটফর্মের নীতি পরিবর্তন হলে এক নিমিষেই আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, ক্রিয়েটরদের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা ব্লগ থাকা জরুরি যাতে কোনো সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টের খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে তাদের জীবিকা হুমকিতে না পড়ে।
৩. নিউজ পেজগুলোর সংকট: বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অনেক ছোট বড় নিউজ পোর্টাল ফটোকার্ডের মাধ্যমে ট্রাফিক ও আয় নিশ্চিত করত। তাদের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। এখন থেকে খবরের পেছনের কারিগরদের আরও সৃজনশীল হতে হবে এবং ভিডিও জার্নালিজমকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ফটোকার্ডের দিন সম্ভবত এখন সূর্যাস্তের পথে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের শুল্ক নীতিতে আদালতের বড় ধাক্কা: ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক ‘অবৈধ’ ঘোষণা
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন