অর্থনীতি ডেস্ক । বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
সোনালী ব্যাংকের হাজার কোটির মুনাফা আর জনতার হাজার কোটির লোকসান—এক অনন্য তুলনা। |
সোনালী ব্যাংকের বিস্ময়কর উত্থান
হলমার্ক কেলেঙ্কারির সেই কালো অধ্যায় পেছনে ফেলে সোনালী ব্যাংক এখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্থিতিশীল। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৯৮৮ কোটি টাকা, যা গত বছরের শেষে এসে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশের সব ব্যাংকের মধ্যে মুনাফার দৌড়ে সোনালী ব্যাংকের অবস্থান এখন তৃতীয়। তালিকার প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক।
সোনালী ব্যাংকের এই সাফল্যের রহস্য কী? ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান জানিয়েছেন, তারা এখন আর বড় শিল্পঋণে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। বরং অলস টাকা ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে নিশ্চিত মুনাফা তুলছেন। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) এবং ভোক্তা ঋণে মনোযোগ দেওয়ায় খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কমেছে। বর্তমানে ব্যাংকটির কোনো মূলধন ঘাটতি বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির অভাব নেই, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জনতা ব্যাংকের ডুবন্ত দশা
সোনালী ব্যাংক যখন সাফল্যের গল্প লিখছে, জনতা ব্যাংক তখন রেকর্ড লোকসানের হাহাকারে মগ্ন। গত বছরের শেষে ব্যাংকটির লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকায়, যা আগের বছর ছিল ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশই এখন খেলাপি।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুষ্টিমেয় কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়াই জনতা ব্যাংকের এই পতনের মূল কারণ। বেক্সিমকো, এস আলম, এননটেক্স এবং ক্রিসেন্ট গ্রুপের মতো বড় ঋণগ্রহীতারা এখন খেলাপি। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে এই ব্যাংকটি। বড় ঋণগ্রহীতাদের অনেকে আইনি মারপ্যাঁচে বা দেশত্যাগ করায় ঋণ আদায় প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অগ্রণী ও রূপালীর ‘কাগজে-কলমে’ মুনাফা
অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের আর্থিক চিত্রকে বিশ্লেষকরা বলছেন ‘কৃত্রিম’। অগ্রণী ব্যাংক গত বছর ৫৮ কোটি টাকা মুনাফা দেখালেও বাস্তবে তাদের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করলে ব্যাংকটি বড় ধরনের লোকসানে থাকত। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ ছাড় পাওয়ায় তারা লোকসান এড়িয়ে মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয়েছে।
একই অবস্থা রূপালী ব্যাংকেরও। আগের বছরের ১১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার মুনাফা গত বছরের শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকায়। আকারে ছোট হলেও এই ব্যাংকটির সংকট অন্য বড় ব্যাংকগুলোর মতোই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত শিথিলতাই মূলত এই ব্যাংকগুলোকে ডুবতে ডুবতে বাঁচিয়ে রাখছে।
নিরাপত্তা সঞ্চিতি: আমানতকারীদের ঝুঁকি
ব্যাংকিং নীতি অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ‘নিরাপত্তা সঞ্চিতি’ (Provisioning) হিসেবে রাখতে হয়। আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এটি বাধ্যতামূলক। কিন্তু জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এই সঞ্চিতি সংরক্ষণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এই ‘বিশেষ ছাড়’ তুলে নেয়, তবে সোনালী ছাড়া বাকি তিনটি ব্যাংকই দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বর্তমান চিত্র নিয়ে বিডি নিউজ সত্যকথা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিহ্নিত করছে:
১. সুশাসনের অভাব ও রাজনৈতিক প্রভাব: জনতা ব্যাংকের এই বিপর্যয়ের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ সবচেয়ে বড় কারণ। বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীকে কোনো বাছবিচার ছাড়াই হাজার হাজার কোটি টাকা দেওয়ার মাশুল গুনছে এখন সাধারণ আমানতকারীরা। সোনালী ব্যাংক সেই পথ থেকে সরে এসে ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ নীতি গ্রহণ করায় আজ তারা সফল।
২. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বিমুখী ভূমিকা: দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে কৃত্রিমভাবে মুনাফা দেখানোর সুযোগ দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। এটি ব্যাংকগুলোকে তাদের ভুল সংশোধনের পরিবর্তে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
৩. সাধারণ মানুষের আতঙ্ক: যখন একটি ব্যাংকের ৭০ শতাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো যদি জনগণের আস্থা হারায়, তবে পুরো দেশের আর্থিক কাঠামো ধসে পড়তে পারে। অবিলম্বে এই ব্যাংকগুলোতে পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ এবং কঠোর ঋণ আদায় প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: বাংলার মসনদে শুভেন্দু, নেপথ্যে মমতার ‘ডিজিটাল’ আত্মসমর্পণ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন