গত মাসের বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ের দল টিভিকে ১০৮টি আসনে জয়লাভ করলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮টি আসনের ম্যাজিক ফিগার থেকে কিছুটা দূরে ছিল। ফলে গত চার দিন ধরে চেন্নাইয়ের রাজনীতিতে চলেছে চরম নাটকীয়তা। রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকারের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের পর অবশেষে কংগ্রেস, ভিসিকে এবং বামপন্থী দলগুলোর সমর্থনে ১২০ জন বিধায়কের শক্তি নিয়ে সরকার গঠন করেন বিজয়।
শনিবার রাতেই বিজয়ের সমর্থনে কংগ্রেসের ৫ জন, ভিসিকের ২ জন এবং সিপিআই ও সিপিআইএমের মোট ৪ জন বিধায়ক তাদের সম্মতিপত্র জমা দেন। রাজভবনে বিজয়ের এই রাজনৈতিক কৌশলের কাছে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে হয় পুরনো দ্রাবিড় দলগুলোকে। আগামী বুধবারের (১৩ মে) মধ্যে বিজয়কে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হবে।
৫০০ রুপি থেকে ২২০ কোটির মুখ্যমন্ত্রী
বিজয়ের এই উত্থান কোনো সিনেমার গল্পের চেয়ে কম নয়। ১৯৮৪ সালে বাবা এস এ চন্দ্রশেখরের হাত ধরে শিশুশিল্পী হিসেবে 'ভেটরি' সিনেমায় অভিনয় শুরু করেছিলেন তিনি। সেই সময় তার পারিশ্রমিক ছিল মাত্র ৫০০ রুপি। আর আজ, রাজনৈতিক মঞ্চে পা রাখার ঠিক আগে তার অভিনীত শেষ ছবি ‘জন নায়কগন’-এর জন্য তিনি পারিশ্রমিক নিয়েছেন ২২০ কোটি রুপি। এই অবিশ্বাস্য ৪ কোটি ৪০ লাখ শতাংশের উত্থানই বলে দেয় তামিল জনতার হৃদয়ে তার স্থান কতটা গভীরে।
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে বিজয়ের আবেগী ভাষণ জনতাকে উদ্বেলিত করে। তিনি বলেন, “আমি কোনো রাজকীয় পরিবার থেকে আসিনি। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা কী, তা আমি জানি। একজন সহকারী পরিচালকের ছেলে আজ আপনাদের ভালোবাসায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে।”
প্রথম দিনেই তিন বড় ঘোষণা
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেই জনকল্যাণমুখী তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে সই করেছেন বিজয়। তার প্রথম সরকারি ঘোষণার মধ্যে রয়েছে:
১. বিনামূল্যে বিদ্যুৎ: সাধারণ মানুষের জন্য ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় বা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান।
২. মাদক নির্মূল: রাজ্যের তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান।
৩. নারী নিরাপত্তা: নারীদের সুরক্ষায় একটি বিশেষ ডেডিকেটেড বাহিনী গঠন।
বিজয় আরও অভিযোগ করেন যে, বিদায়ী সরকার (ডিএমকে) রাজ্যের কোষাগার শূন্য করে দিয়ে ১০ লাখ কোটি রুপি ঋণ রেখে গেছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, জনগণের একটি পয়সাও কেউ লুণ্ঠন করতে পারবে না।
তৃষা ও রাহুলের উপস্থিতি: আলোচনার কেন্দ্রে
বিজয়ের এই ঐতিহাসিক দিনে ভিআইপি গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর কংগ্রেসই প্রথম তাকে সমর্থন জানিয়েছিল। তবে সব ছাপিয়ে আলোচনায় ছিলেন বিজয়ের দীর্ঘদিনের সহ-অভিনেত্রী তৃষা কৃষ্ণান। হালকা সবুজ শাড়িতে তৃষার উপস্থিতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে জল্পনা তৈরি করেছে। সাংবাদিকদের তৃষা বলেন, “আমি এই মুহূর্তটির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় ছিলাম।” বিজয়ের ব্যক্তিগত জীবন ও তৃষার সঙ্গে তার বন্ধুত্বের গুঞ্জনের মাঝেই এই উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
তামিলনাড়ুর এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনকে বিডি নিউজ সত্যকথা তিনটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করছে:
১. দ্রাবিড় রাজনীতির পতন: ১৯২৭ সাল থেকে যে দ্রাবিড় আদর্শ (পেরিয়ারের আদর্শ) তামিলনাড়ু শাসন করেছে, বিজয়ের এই জয় সেই দুর্গে বড় ফাটল ধরিয়েছে। মানুষ এখন জাতিগত রাজনীতির চেয়ে উন্নয়ন এবং স্বচ্ছ ইমেজের ওপর বেশি ভরসা করছে। বিজয়ের ‘ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক ন্যায়’ স্লোগানটি মূলত দ্রাবিড় ও আধুনিক রাজনীতির এক মিশেল।
২. বিজেপি ও কংগ্রেসের কৌশল: তামিলনাড়ুতে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে জমি পাওয়ার চেষ্টা করলেও বিজয়কে সরাসরি অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী একটি ইতিবাচক সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে, কংগ্রেস ডিএমকে-এর সঙ্গ ছেড়ে বিজয়ের হাত ধরায় দক্ষিণের রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হলো। এটি জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।
৩. একক ক্ষমতার কেন্দ্র: বিজয়ের ভাষণে একটি বাক্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— “আমাকে ছাড়া আর কোনো ক্ষমতার কেন্দ্র থাকবে না।” এর মাধ্যমে তিনি তার জোটসঙ্গীদের বার্তা দিয়েছেন যে, সরকার পরিচালনায় তিনি কারো হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করবেন না। একজন সুপারস্টার হিসেবে তার যে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা, তাকে তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতায় রূপান্তর করতে কতটা সফল হন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিংয়ে চরম বৈপরীত্য: সোনালী ব্যাংকের হাজার কোটির মুনাফা, তলানিতে জনতা
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন