আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| ট্রাম্পকে যুদ্ধে টেনে নিয়েছেন নেতানিয়াহু: কমলা হ্যারিস। ছবি: বিডি নিউজ সত্যকথা। |
মিশিগানের মঞ্চে হ্যারিসের আক্রমণ
শনিবার (১৮ এপ্রিল) মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েটে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির একটি তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে দর্শকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে কমলা হ্যারিস এসব মন্তব্য করেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হওয়ার পর এটি ছিল তার অন্যতম বড় রাজনৈতিক আক্রমণ।
হ্যারিস বলেন, "আমাদের একটি বিষয়ে খুব স্পষ্ট থাকতে হবে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে একটি যুদ্ধের ভেতরে নিয়ে গেছেন। মূলত নেতানিয়াহুই তাকে এই পথে টেনে নিয়েছেন।" তিনি আরও যোগ করেন, ট্রাম্প এমনভাবে নিজেকে শক্তিশালী হিসেবে উপস্থাপন করতে চান, যেন তিনি ইচ্ছামতো যে কারও বিরুদ্ধে আমেরিকার সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে পারেন, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি ও জনগণের অনীহা
হ্যারিস তার বক্তব্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "ট্রাম্প এমন একটি সংঘাত শুরু করেছেন যা অপ্রয়োজনীয়। এর ফলে আমাদের সাহসী সেনাদের জীবন আজ ঝুঁকির মুখে। আমেরিকার মানুষ শান্তি চায়, তারা নতুন কোনো যুদ্ধ চায় না।" তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে দেশের ইতিহাসে 'সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত, নির্মম ও অদক্ষ' বলে আখ্যা দেন। হ্যারিসের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের জোট ও বন্ধুত্বের বন্ধনগুলোকে রক্ষা করার পরিবর্তে সেগুলোকে তুচ্ছ করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্বের নিয়মাবলী প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করেছেন।
নেতানিয়াহুর প্রত্যাখ্যান ও ট্রাম্পের অবস্থান
কমলা হ্যারিসের এই বিস্ফোরক অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বেশ দর্পভরে বলেছিলেন, "কেউ কি সত্যিই মনে করে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কেউ বলে দিতে পারে তার কী করতে হবে? তিনি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে সক্ষম।"
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি হ্যারিসের এই মন্তব্যের কোনো উত্তর না দিলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসরায়েলের প্রতি তার অটল সমর্থনের কথা আবারও জানিয়েছেন। ইসরায়েলকে 'মহান মিত্র' হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প লেখেন, "ইসরায়েল সাহসী, নির্ভীক এবং অনুগত। তারা জানে কীভাবে লড়াই করতে হয় এবং কীভাবে জয়ী হতে হয়। তারা কঠিন সময়ে আমেরিকার আসল বন্ধু হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে।"
২০২৮-এর হাতছানি: হ্যারিস কি ফিরছেন?
গত নির্বাচনে হেরে গেলেও রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাননি কমলা হ্যারিস। বিবিসির সাথে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তিনি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুনরায় লড়ার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন। হ্যারিস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, হোয়াইট হাউস একদিন অবশ্যই একজন নারী প্রেসিডেন্ট পাবে। মিশিগানের এই অনুষ্ঠানটি মূলত তার সেই নির্বাচনী প্রচারণারই একটি অংশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
'বিডি নিউজ সত্যকথা' বিশ্লেষণ: হ্যারিসের আক্রমণের নেপথ্যে কী?
বিডি নিউজ সত্যকথা-এর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক প্যানেল মনে করছে, কমলা হ্যারিসের এই বক্তব্য নিছক সমালোচনা নয়, বরং এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে:
১. যুদ্ধবিরোধী ভোট ব্যাংক: আমেরিকার একটি বড় অংশ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে মার্কিন হস্তক্ষেপ পছন্দ করছে না। হ্যারিস মূলত এই ভোটারদের সহানুভূতি পেতেই ট্রাম্পকে 'যুদ্ধবাজ' হিসেবে চিত্রিত করছেন।
২. ইসরায়েল-ভীতি ব্যবহার: ইসরায়েলের সাথে ট্রাম্পের অতি-ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ডেমোক্র্যাটরা সবসময়ই নেতিবাচকভাবে তুলে ধরে। হ্যারিস বোঝাতে চেয়েছেন যে, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি ওয়াশিংটন থেকে নয়, বরং তেল আবিব থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে—যা একজন মার্কিন ভোটারের আত্মমর্যাদায় আঘাত হানতে পারে।
৩. সেনা পরিবারের আবেগ: মার্কিন সেনাদের ঝুঁকির কথা বলে তিনি সামরিক পরিবারের ভোটগুলো ডেমোক্র্যাটিক দলের দিকে টানার চেষ্টা করছেন।
৪. ব্যর্থতা আড়াল করা: বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসনের সময়কার বৈদেশিক নীতি নিয়ে যে সমালোচনা ছিল, তা থেকে মানুষের নজর সরিয়ে ট্রাম্পের বর্তমান সংঘাতকে বড় করে দেখানোটাই তার অন্যতম লক্ষ্য।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কেবল রণক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন আমেরিকার ঘরোয়া রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কমলা হ্যারিসের এই আক্রমণ ২০২৮ সালের নির্বাচনের ডামাডোল এখনই বাজিয়ে দিল কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে ট্রাম্প যেভাবে ইসরায়েলের সমর্থনে অটল রয়েছেন, তাতে মার্কিন রাজনীতিতে মেরুকরণ আরও তীব্র হবে।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে অস্থিরতা: শেষ পর্যন্ত দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন