সত্যকথা রিপোর্ট
![]() |
| দেশে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে সরকার। ছবি: বিডি নিউজ সত্যকথা। |
নতুন দরে তেলের দাম কত?
মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এখন থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা (আগে ছিল ১০০ টাকা), অকটেন ১৪০ টাকা (আগে ছিল ১২০ টাকা), পেট্রোল ১৩৫ টাকা (আগে ছিল ১১৬ টাকা) এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা (আগে ছিল ১১২ টাকা) দরে বিক্রি হবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা এবং অকটেনে সর্বোচ্চ ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন এই মূল্যবৃদ্ধি? সরকারের ব্যাখ্যা
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে এই সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। মূলত ‘জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা’ অনুযায়ী প্রতি মাসে দাম সমন্বয়ের নিয়ম থাকলেও, জনস্বার্থ বিবেচনা করে গত দুই মাস দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির চাপে সরকার শেষ পর্যন্ত দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
এর আগে গত ৭ এপ্রিল জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ২০২ টাকা ২৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২২৭ টাকা ০৮ পয়সা করা হয়েছিল। এবার সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত ডিজেল-অকটেনের ওপরও সেই প্রভাব আছড়ে পড়ল।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি সংকট
জ্বালানি সংকটের মূল কারণ লুকিয়ে আছে কয়েক হাজার মাইল দূরে পারস্য উপসাগরে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে গোটা অঞ্চল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় বিশ্ব তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়ে। ইরান এই প্রণালি একাধিকবার বন্ধ ঘোষণা করায় বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশও এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি।
পাম্পে ভিড় ও তেলের কৃত্রিম সংকট
দামের ঘোষণার আগেই গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ ছিল, চাহিদা মতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক পাম্প মালিক দাম বাড়বে এমন আশঙ্কায় তেল মজুদ করে রেখেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, সারা দেশে অভিযান চালিয়ে ইতিমধ্যে ৫ লাখ লিটারের বেশি অবৈধভাবে মজুদ করা তেল উদ্ধার করা হয়েছে। সরকারের দাবি, দেশে পর্যাপ্ত তেল মজুদ রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে।
'বিডি নিউজ সত্যকথা' বিশ্লেষণ: সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপের বোঝা
জ্বালানি তেলের এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কতটা গভীর হতে পারে, তা নিয়ে বিডি নিউজ সত্যকথা-এর বিশেষ বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. পরিবহন ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধি: ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে গণপরিবহন ও পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়ায়। পরিবহন ব্যয় বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই চাল, ডাল, সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আরও এক দফা বাড়তে পারে, যা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলবে।
২. কৃষি উৎপাদন ব্যাহত: বাংলাদেশে সেচ কাজে ব্যাপকহারে ডিজেল চালিত পাম্প ব্যবহার করা হয়। লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় বোরো ও রবি মৌসুমে কৃষকের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর ফলে চালের উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৩. মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা: জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সাধারণত সব ধরনের সেবা ও পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এতে করে দেশের বার্ষিক মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও সংকুচিত হতে পারে।
৪. বিকল্প জ্বালানি ও সাশ্রয়: বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে সৌরশক্তি বা বিকল্প জ্বালানির দিকে সরকারের আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্ববাজারের অস্থিরতা সামাল দিতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত হয়তো সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় ছিল, কিন্তু প্রান্তিক মানুষের জন্য এটি একটি বড় দুঃসংবাদ। এখন দেখার বিষয়, জ্বালানির দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে পরিবহন ও বাজার সিন্ডিকেট যেন সাধারণ মানুষকে জিম্মি করতে না পারে, সেদিকে প্রশাসন কতটা কঠোর ভূমিকা পালন করে।
আরও পড়ুন: বিগত দুই সরকারের টিকাদান গাফিলতি ক্ষমাহীন অপরাধ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন