আন্তর্জাতিক ডেস্ক। বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| পাকিস্তানের ইসলামাবাদে সেরেনা হোটেলে সরাসরি সংলাপে মুখোমুখি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রতিনিধিরা (প্রতীকী ছবি) |
শোকাতুর প্রবেশ: ইরানি প্রতিনিধিদের ভিন্নধর্মী প্রতিবাদ
বৈঠকের শুরুতেই এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইরানি প্রতিনিধিরা কোনো আনুষ্ঠানিক পোশাকের পরিবর্তে কালো রঙের শোকের পোশাক পরে বৈঠকে যোগ দেন। মার্কিন হামলায় নিহত ইরানি স্কুল শিক্ষার্থীদের স্মৃতি হিসেবে তারা নিহতদের ছোট ছোট জুতা এবং রক্তমাখা ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে আসেন। এই প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যমে তারা মার্কিন আগ্রাসনের ভয়াবহতা সরাসরি আলোচনার টেবিলে তুলে ধরেন। তাদের এই পদক্ষেপ বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করে।
রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সাতটি জ্বলন্ত ইস্যু
ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে মূলত সাতটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দরকষাকষি চলছে। আলোচনার মূল স্তম্ভগুলো হলো:
১. লেবাননে যুদ্ধবিরতি: ইরান অবিলম্বে লেবাননে ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। তেহরানের দাবি, গত এক মাসে সেখানে প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এটি মূল চুক্তির বাইরের বিষয়।
২. নিষেধাজ্ঞা ও ৬০০ কোটি ডলার: ইরানের আটকে থাকা ৬০০ কোটি ডলার ছাড় এবং দেশটির অর্থনীতির ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ওয়াশিংটন এই অর্থ ছাড় দিতে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে।
৩. হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ: ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব এবং টোল আদায়ের অধিকার চায়। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন চায় কোনো শর্ত ছাড়াই এটি সব দেশের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
৪. পারমাণবিক ও মিসাইল কর্মসূচি: যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং দূরপাল্লার মিসাইল কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ হোক। কিন্তু ইরান তাদের আত্মরক্ষার স্বার্থে মিসাইল কর্মসূচিতে কোনো আপস করতে রাজি নয়।
৫. ক্ষতিপূরণ: গত কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধে ইরানের অবকাঠামোগত যে বিশাল ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য মার্কিন প্রশাসনের কাছে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে তেহরান।
৬. আঞ্চলিক প্রভাব: মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ইরান।
৭. ইসরায়েলি সীমান্ত নীতি: লেবাননের বৈরুতসহ প্রধান শহরগুলোতে হামলা বন্ধের বিষয়ে ওয়াশিংটন কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও ইসরায়েলের নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো ছাড় দিতে নারাজ তারা।
নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় ইসলামাবাদ: রেড জোন ঘোষিত
এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠককে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদ এখন এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। শহরের প্রায় ২০ লাখ মানুষকে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়ে রাখা হয়েছে। সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের তত্ত্বাবধানে হাজার হাজার প্যারা-মিলিটারি সদস্য শহরটির 'রেড জোন' এলাকায় মোতায়েন রয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেটে আংশিক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের হুঙ্কার বনাম ইরানের ১০ দফা: হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধে বিশ্বশক্তি
জেডি ভ্যান্স ও কুশনারের অংশগ্রহণ
মার্কিন প্রতিনিধি দলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ব্যক্তিগত দূতিয়ালিতে কুশনারের অতীতের রেকর্ড থাকায় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পর্দার আড়ালে কোনো বড় ডিল বা সমঝোতা ইতোমধ্যেই পাকা হয়ে গেছে। অন্যদিকে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কঠোর অবস্থান ইরানি প্রতিনিধিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৬০০ কোটি ডলার ও কাতারের ভূমিকা
২০২৩ সালে দোহা চুক্তির অধীনে যে ৬০০ কোটি ডলার আটকে ছিল, তা এই আলোচনার ‘আইসব্রেকার’ বা বরফ গলানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। এই অর্থ মূলত দক্ষিণ কোরিয়ায় ইরানের তেল বিক্রির টাকা ছিল। ইরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অর্থ দ্রুত ছাড় দেয়, তবেই কেবল পরবর্তী আলোচনার পরিবেশ বজায় থাকবে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
ইসলামাবাদ বৈঠকটি কেবল একটি রাজনৈতিক বৈঠক নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে টোল বসাতে সফল হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের শর্ত না মেনে পুনরায় হামলা শুরু করে, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক মহাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।
আমাদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জ্যারেড কুশনারের অংশগ্রহণ ইঙ্গিত দেয় যে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের চেয়ে অর্থনৈতিক সমঝোতা বা ‘বিজনেসম্যান ডিল’-এ বেশি আগ্রহী। তবে ইরানের প্রতিনিধিরা নিহতদের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে আসার মাধ্যমে এটি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তারা কেবল অর্থ নয়, বরং জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় বদ্ধপরিকর। খামেনি পরবর্তী ইরানে নতুন নেতৃত্বের জন্য এটি অগ্নিপরীক্ষা। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতা এই সংকটের সমাধানে কতটুকু কার্যকর হয়, তা দেখার জন্য বিশ্ববাসীকে আগামী কয়েক দিন ইসলামাবাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন