আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন সংলাপ কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ(প্রতীকী ছবি) |
রুদ্ধশ্বাস ২১ ঘণ্টা: কী ঘটেছিল আলোচনার টেবিলে?
শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকে দুই চিরবৈরী দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি মুখোমুখি বসেছিলেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, "আমরা ২১ ঘণ্টা ধরে নিবিড় আলোচনা চালিয়েছি, যা ইতিবাচক। কিন্তু খারাপ খবর হলো, আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি।" হোয়াইট হাউস সূত্র জানায়, আলোচনার পুরো সময়জুড়ে মার্কিন প্রতিনিধি দল অন্তত ১২ বার সরাসরি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ফোনে পরামর্শ করেছেন।
আলোচনা শেষে বিমানবাহিনী ২-এর (Air Force Two) সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় নেওয়ার আগে ভ্যান্স এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান, যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘ফাইনাল অ্যান্ড বেস্ট অফার’ বা শেষ এবং সেরা প্রস্তাব দিয়ে এসেছে। এখন এই প্রস্তাব ইরান গ্রহণ করবে কি না, তা সম্পূর্ণ তাদের ওপর নির্ভর করছে। ভ্যান্সের ভাষায়, "এটি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য অনেক বেশি খারাপ খবর।"
অচলাবস্থার মূলে যা ছিল: পরমাণু প্রকল্প ও হরমুজ প্রণালি
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দুই দেশের অনড় অবস্থানকে দায়ী করা হচ্ছে। মার্কিন পক্ষের দাবি ছিল:
১. পরমাণু অস্ত্রের স্থায়ী প্রতিশ্রুতি: ইরানকে স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করতে হবে যে তারা কেবল এখন নয়, চিরতরে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম পরিত্যাগ করবে।
২. হরমুজ প্রণালির অবাধ চলাচল: বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহকারী এই জলপথটি কোনো ধরনের টোল বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই উন্মুক্ত রাখতে হবে।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই ব্যর্থতার জন্য ওয়াশিংটনের ‘অযৌক্তিক এবং অতিরিক্ত দাবি’কে দায়ী করেছেন। তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ময়দানে যা অর্জন করতে পারেনি, আলোচনার টেবিলে বসে তা কৌশলে দখল করতে চেয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্ব এবং ‘ট্রানজিট ফি’ আদায়ের দাবিতে অনড় ছিল ইরান। ইরানি প্রতিনিধি দলের মতে, জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে তারা কোনো তড়িঘড়ি চুক্তিতে সই করবে না।
ট্রাম্পের ‘বধিরকারী নীরবতা’ ও নৌ-অবরোধের হুমকি
শান্তি সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রহস্যজনক নীরবতা বিশ্ব মহলে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তবে তিনি তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি নিবন্ধ শেয়ার করেছেন, যেখানে ইরানের ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কূটনৈতিক পথ ব্যর্থ হওয়ায় ট্রাম্প এখন ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়ার কৌশল নিতে পারেন। বিশেষ করে ইরান থেকে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিতে সমুদ্রসীমায় কঠোর সামরিক বেষ্টনী তৈরির পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন।
আরও পড়ুন: ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক সরাসরি বৈঠক
সেন্টকমের তৎপরতা ও সমুদ্র মাইন আতঙ্ক
এদিকে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পেতে রাখা মাইন অপসারণের কাজ শুরু করতে দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ—ইউএসএস ফ্র্যাঙ্ক ই. পিটারসন এবং ইউএসএস মাইকেল মারফি ওই এলাকায় প্রবেশ করেছে। যদিও তেহরান এই মাইন পাতার দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, কোনো সামরিক জাহাজ বিনা অনুমতিতে সেখানে প্রবেশ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের অবস্থান
পাকিস্তান সরকার এই ঐতিহাসিক সংলাপ আয়োজনে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং আতিথেয়তা নিশ্চিত করেছিল। প্রায় ১০ হাজার অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে পুরো ইসলামাবাদকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়েছিল। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, "সংলাপ ব্যর্থ হলেও বর্তমান যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা অপরিহার্য।" পাকিস্তান এখনো আশা করছে যে দুই পক্ষ যেন যুদ্ধের পথে না ফিরে পুনরায় কূটনীতির পথে ফেরে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার এই ম্যারাথন সংলাপ ব্যর্থ হওয়া কেবল একটি কূটনৈতিক পরাজয় নয়, এটি একটি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহাপ্রলয়ের সংকেত। আমাদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে:
প্রথমত, জেডি ভ্যান্সের দেওয়া ‘শেষ প্রস্তাব’ আসলে একটি আলটিমেটাম। ইরান যদি এটি গ্রহণ না করে, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ আরও ভয়াবহভাবে শুরু করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ প্রবেশের ঘোষণা ইঙ্গিত দেয় যে, সমুদ্রের এই সরু পথে শীঘ্রই বড় ধরনের নৌ-সংঘাত শুরু হতে পারে।
তৃতীয়ত, ইরানের কৌশলী অবস্থান—অর্থাৎ একদিকে ‘কূটনীতি শেষ হয় না’ বলা এবং অন্যদিকে হরমুজ ইস্যুতে অনড় থাকা—ইঙ্গিত দেয় যে তেহরান রাশিয়ার বা চীনের সরাসরি সমর্থন পাওয়ার অপেক্ষায় আছে।
সব মিলিয়ে, বিশ্ব এখন এক বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আগামী ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগেই যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য কেবল তেলের খনি নয়, বরং আগুনের কুণ্ডলীতে পরিণত হতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন