![]() |
| হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং নতুন প্রস্তাবিত টোল রুটের মানচিত্র (প্রতীকী ছবি) |
শান্তিকালীন স্বর্গ থেকে যুদ্ধকালীন নরক
যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি ছিল বিশ্বের সবথেকে নিরাপদ এবং উন্মুক্ত জলপথ। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, এখানে চলাচলের জন্য কোনো জাহাজকে কোনো ধরনের মাশুল বা টোল দিতে হতো না। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই সরবরাহ করা হতো। কিন্তু গত পাঁচ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাত সব চিত্র বদলে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি আক্রমণের জবাবে ইরান এই প্রণালিতে ‘শত্রু’ দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করলে চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে স্মরণকালের ভয়াবহতম সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে যুদ্ধবিরতি চললেও জাহাজ চলাচলের ওপর তেহরান যে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে, তা নিরবচ্ছিন্ন বিশ্ব বাণিজ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ইরানের নতুন মানচিত্র ও মাইনের আতঙ্ক
বুধবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) প্রণালিটির একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এই মানচিত্রে জাহাজগুলোকে ওমান উপকূলের পুরোনো পথটি এড়িয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি রুট ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, নতুন এই রুটটি ওমান উপকূল থেকে সরিয়ে আরও উত্তরে ইরানের উপকূল ঘেঁষে নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আইআরজিসি দাবি করেছে যে, পুরোনো রুটে প্রচুর পরিমাণ জাহাজবিধ্বংসী মাইন থাকতে পারে, যা নেভিগেশনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তৃতীয়ত, সব নৌযানকে বাধ্যতামূলকভাবে এই নতুন রুট এবং ইরানের সমন্বয় মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দিল্লিভিত্তিক সমুদ্রবিষয়ক বিশ্লেষক সি উদয় ভাস্কর আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, "যদি কোনো জাহাজের মালিককে বলা হয় যে পথে মাইন পোঁতা আছে, তবে তিনি ঝুঁকি না নিয়ে ইরানিদের কথা মানতেই বাধ্য হবেন। কারণ একটি বড় তেলবাহী জাহাজের দাম প্রায় ২৫ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।"
টোল আদায়ের বিতর্কিত পরিকল্পনা
ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা শান্তি পরিকল্পনার অন্যতম বিতর্কিত অংশ হলো হরমুজ প্রণালিতে টোল আদায়। যদিও পরিকল্পনাটি এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি, তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্রমতে:
জাহাজ প্রতি টোল: প্রতিটি বড় জাহাজের কাছ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল আদায়ের পরিকল্পনা করছে তেহরান।
ব্যারেল প্রতি শুল্ক: অন্য একটি সূত্র বলছে, সরবরাহ করা প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য ১ ডলার করে টোল নেওয়া হতে পারে।
রাজস্বের ব্যবহার: ইরান জানিয়েছে, এই অর্থ তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে ব্যয় করবে।
মুদ্রা কৌশল: ইতোমধ্যেই কিছু জাহাজ থেকে চীনের মুদ্রা ‘ইউয়ানে’ টোল আদায়ের খবর পাওয়া গেছে, যা মার্কিন ডলারের আধিপত্য কমানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ওমান এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেছে। ওমানের পরিবহনমন্ত্রী সাইদ আল-মাওয়ালি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী এ ধরনের টোল আদায় করা অবৈধ এবং ওমান কখনোই এর অংশ হবে না।
আরও পড়ুন: ইসলামাবাদে শান্তি সংলাপের আগে ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি: আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
আন্তর্জাতিক আইন ও ট্রাম্পের অবস্থান
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, আলোচনা চলাকালীন মার্কিন সেনাবাহিনী ওই এলাকায় অবস্থান করবে এবং হরমুজ প্রণালিকে ‘উন্মুক্ত ও নিরাপদ’ রাখতে সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, আলোচনা সফল না হলে পুনরায় হামলা শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবে মার্কিন সেনারা ঠিক কতটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
গ্লোবাল রিঅ্যাকশন: কে কার পক্ষে?
হরমুজ সংকটে বিশ্ব শক্তিগুলো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। গত ৭ এপ্রিল বাহরাইনের তোলা একটি নিরাপত্তা পরিষদ প্রস্তাবে কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থন দিলেও রাশিয়া ও চীন তাতে ভেটো দিয়েছে। চীন ও রাশিয়ার দাবি, এই সংকটের মূল কারণ ইরানের ওপর চালানো প্রাথমিক হামলা, যা প্রস্তাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চীন ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা হওয়ায় তারা তেহরানের ইউয়ান-ভিত্তিক লেনদেনকে সমর্থন দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই নিয়ন্ত্রণ কেবল একটি সামরিক বিজয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক যুদ্ধের অংশ। ইরান খুব সুক্ষ্মভাবে ‘মাইন’ এবং ‘নিরাপদ রুট’-এর অজুহাত দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে অর্থ আদায়ের পথ তৈরি করছে।
আমাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, যদি বিশ্বশক্তিগুলো ইরানের এই টোল আদায়ের দাবি মেনে নেয়, তবে এটি ভবিষ্যতে একটি বিপজ্জনক নজির হয়ে থাকবে। এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম বিশ্ববাজারে হু হু করে বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। অন্যদিকে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা যদি আবারও বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ব বাণিজ্য পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়বে। ট্রাম্পের ‘সর্বাধুনিক অস্ত্র’ এবং খামেনির ‘টোল আদায়ের জেদ’—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে বিশ্ব অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। শান্তি আলোচনার সাফল্যই এখন একমাত্র ভরসা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন