![]() |
| ইসলামাবাদে শান্তি সংলাপের আগে ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি ও ইরানের অনমনীয় অবস্থান (প্রতীকী ছবি) |
ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বার্তা ও ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্ট
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ইরান সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের কোনো প্রকৃত সামরিক বা কূটনৈতিক শক্ত অবস্থান নেই। তিনি লিখেছেন, “ইরানিরা সম্ভবত বুঝতে পারছে না, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে সাময়িকভাবে বিশ্বকে জিম্মি করা ছাড়া তাদের কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। তাদের নেতারা শুধুমাত্র এই আলোচনার জন্যই এখন পর্যন্ত টিকে আছে।” ট্রাম্প আরও কটাক্ষ করে বলেন যে, ইরানিরা যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে মিথ্যা প্রচারণা এবং গণযোগাযোগের কৌশলে বেশি দক্ষ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আলোচনার টেবিলে বসার আগে ইরানকে মানসিকভাবে চাপে রাখতেই ট্রাম্প এমন আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছেন।
ব্যর্থ হলে নতুন হামলার হুমকি: প্রস্তুত উন্নত অস্ত্র
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক পোস্ট’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও ভয়াবহ ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যদি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় এই আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে ইরানে নতুন করে এবং আরও ভয়াবহভাবে হামলা চালানো হবে। ট্রাম্পের ভাষায়, “আমাদের নতুন করে শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। আমরা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোতে এখন পর্যন্ত তৈরি হওয়া সবথেকে উন্নত অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংযোজন করছি। যদি আলোচনা সফল না হয়, তবে আগের হামলার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী আঘাত হানা হবে।” তিনি দাবি করেন, এর আগের মার্কিন হামলায় ইরান ইতোমধ্যেই ‘চূর্ণ-বিচূর্ণ’ হয়ে গেছে এবং পরবর্তী হামলা হবে তাদের জন্য চূড়ান্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা ও তেহরানের পাল্টা অবস্থান
ইসলামাবাদ বৈঠকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ওয়াশিংটন তাদের সুনির্দিষ্ট ১৫ দফা পরিকল্পনা টেবিলে রেখেছে। প্রথমত, তারা ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। দ্বিতীয়ত, তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপের বিষয়টিও এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান শর্ত। তৃতীয়ত, এই শর্তগুলো মানলে ইরানের ওপর থেকে পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং বিশ্ব বাণিজ্যের স্বার্থে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।
অন্যদিকে, ইরানও তাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ১০ দফা পাল্টা পরিকল্পনা পেশ করেছে। তাদের প্রধান দাবি হলো, হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর নির্দিষ্ট হারে টোল বা শুল্ক আরোপ করা। পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যে সব ধরনের বিদেশি সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করা এবং বিদেশের ব্যাংকে জব্দ থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ অবিলম্বে ছাড় দেওয়ার শর্ত দিয়েছে তারা। পরিশেষে, তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, সব আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: ডিজিটাল সেবায় নতুন দিগন্ত: চালু হলো জাতীয় তথ্য বাতায়নের ‘ফ্রেমওয়ার্ক ২.০’
লেবানন ইস্যু: একটি বড় বাধা
আলোচনার পথে সবথেকে বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে লেবানন পরিস্থিতি। গাজা ও ইরানের সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকায় লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দাবি করেছেন যে, যুদ্ধবিরতির মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইসরায়েলের সুরেই কথা বলেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি মনে করেন, লেবানন ইস্যু নিয়ে ইরানের সাথে ‘যৌক্তিক ভুল বোঝাবুঝি’ থাকতে পারে, তবে এ কারণে মূল আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হবে বোকামি। এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সতর্ক করেছেন যে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা চলতে থাকায় আলোচনার কোনো অর্থ হয় না।
ইসলামাবাদে জেডি ভ্যান্স: আশার আলো না কি সতর্কবাণী?
শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইতোমধ্যে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। এয়ারফোর্স টুতে ওঠার আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ‘স্পষ্ট নির্দেশনা’ দিয়েছেন। ভ্যান্স বলেন, “আমি এই আলোচনা নিয়ে আশাবাদী, তবে ইরান যদি আমাদের সাথে প্রতারণা করতে চায়, তবে তারা দেখবে যে এই আলোচক দলটি মোটেও সহানুভূতিশীল নয়।” তিনি তেহরানের উদ্দেশ্যে কড়া হুশিয়ারি দিয়ে জানান যে, মার্কিন স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই ঐতিহাসিক বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক ভাষা এবং ইরানের অনমনীয় শর্তাবলি এটাই প্রমাণ করে যে, দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট চরম পর্যায়ে। আমাদের বিশ্লেষণে মনে হয়, পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অত্যন্ত জটিল এক দায়িত্ব পালন করছে। ট্রাম্পের ‘অত্যাধুনিক অস্ত্র’ ব্যবহারের হুমকি এবং ইরানের ‘হাত ট্রিগারে’ থাকার হুঙ্কার মূলত টেবিলের শক্ত অবস্থান জানান দেওয়ার কৌশল। তবে লেবানন ইস্যুটি যদি আলোচনার টেবিলে সঠিকভাবে সমাধান না করা যায়, তবে এই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। বিশেষ করে ইরানের জব্দকৃত অর্থ এবং হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের বিষয়টি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। শান্তি আসবে কি না, তা নির্ভর করছে উভয় পক্ষের ছাড় দেওয়ার মানসিকতার ওপর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন