আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
লেবাননে যুদ্ধবিরতির পর ইরানের হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার ঘোষণা। ছবি: প্রতীকী / বিডি নিউজ সত্যকথা। |
হরমুজ প্রণালি: অবরুদ্ধ থেকে উন্মুক্ত
শুক্রবার ভোরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তার অফিসিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। তিনি জানান, লেবাননে কার্যকর হওয়া ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ইরান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আরাঘচি লেখেন, "লেবাননের যুদ্ধবিরতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ঘোষণা করা হলো। আমাদের নির্ধারিত রুট দিয়ে এখন থেকে জাহাজগুলো নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে।"
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান এই প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছিল। আজ শুক্রবার ভোর ৩টা থেকে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এই জলপথটি পুনরায় সচল হলো।
ট্রাম্পের ধন্যবাদ ও চুক্তির পথে ওয়াশিংটন-তেহরান
ইরানের এই ঘোষণাকে তাৎক্ষণিক স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে তিনি লিখেছেন, "ইরান এইমাত্র ঘোষণা করেছে যে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং চলাচলের জন্য প্রস্তুত। ধন্যবাদ!"
শুধু তাই নয়, হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প এক বিষ্ফোরক তথ্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তির 'খুব কাছাকাছি' রয়েছে। ট্রাম্পের মতে, ইরান তাদের পরিশোধিত ইউরেনিয়াম বা 'নিউক্লিয়ার ডাস্ট' হস্তান্তর করতেও সম্মত হয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রধান উপাদান। ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই ঐতিহাসিক চুক্তি সই করতে তিনি পাকিস্তান সফরেও যেতে পারেন।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের কড়া বার্তা ও কূটনৈতিক তৎপরতা
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক টেলিভিশন ভাষণে দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো চাপের মুখেই ইসরায়েল লেবাননে যুদ্ধবিরতি মানতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, "ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র চায়নি। আমরা শান্তি চাই, তবে আমাদের মর্যাদা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না।"
তিনি এই শান্তি প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনিরের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খতিবজাদেহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরান কেবল সাময়িক কোনো বিরতি নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে একটি স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের অবসান চায়।
জ্বালানি বাজারের ক্ষত ও পুনর্গঠন
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এই যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। বিশেষ করে ইরাক ও সৌদি আরবের তেল উৎপাদন ব্যবস্থা পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে দীর্ঘ মেয়াদী বিনিয়োগ প্রয়োজন। হরমুজ প্রণালি খুলে যাওয়ায় এখন প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহনের পথ সুগম হলো, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
লেবাননের রাজপথে উল্লাস
অন্যদিকে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে বৈরুতের রাজপথে মানুষের ঢল নেমেছে। হাজার হাজার মানুষ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। যদিও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে বিচ্ছিন্ন কিছু গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে, তবে সামগ্রিকভাবে শান্তি বজায় রয়েছে।
'বিডি নিউজ সত্যকথা' বিশ্লেষণ: এটি কি স্থায়ী শান্তি না কি রণকৌশল?
মধ্যপ্রাচ্যের এই নাটকীয় মোড়কে বিডি নিউজ সত্যকথা-এর বিশ্লেষক দল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে:
১. ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ইমেজ ও নির্বাচন: ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই 'যুদ্ধ বন্ধের' প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিলেন। ইরানের সাথে চুক্তি করতে পারলে এটি হবে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক জয়। পাকিস্তান সফরের ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের প্রভাব আরও মজবুত করতে চাইছেন।
২. ইরানের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা: দীর্ঘ অবরোধ এবং যুদ্ধের কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি বিপর্যস্ত। হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা এবং ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তেহরান মূলত নিজেদের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পথ তৈরি করছে।
৩. নিউক্লিয়ার ডাস্ট ও পাকিস্তানের ভূমিকা: ইউরেনিয়াম হস্তান্তর একটি বড় তাসের কার্ড। পাকিস্তান যেভাবে দুই শত্রুপক্ষকে এক টেবিলে বসিয়েছে, তা বৈশ্বিক কূটনীতিতে ইসলামাবাদের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে ইসরায়েল এই চুক্তিকে কতটা মেনে নেবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
৪. স্থায়ী বনাম সাময়িক বিরতি: ইরান স্থায়ী শান্তির কথা বললেও লেবাননে মাত্র ১০ দিনের বিরতি ঘোষণা করা হয়েছে। এই ১০ দিন যদি কোনো বড় ধরণের উস্কানি না ঘটে, তবেই কেবল একটি স্থায়ী চুক্তির স্বপ্ন দেখা সম্ভব।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি লাইফলাইন। যদি ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের মধ্যে আগামী সপ্তাহে পাকিস্তানে বৈঠকটি সফল হয়, তবে হয়তো আমরা দশকের অন্যতম বড় শান্তি চুক্তির সাক্ষী হতে যাচ্ছি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর রাজনীতিতে শেষ মুহূর্তের চমক সবসময়ই থাকে।
আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালিতে বরফ গলছে? তেহরানের নতুন প্রস্তাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির আভাস
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন