আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| পাকিস্তান-ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক পরিস্থিতির একটি প্রতীকী চিত্র। (বিডি নিউজ সত্যকথা) |
সমঝোতার প্রস্তাব ও ইরানের শর্ত
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ইরানের এই পদক্ষেপকে যুদ্ধ পরবর্তী স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরানোর ক্ষেত্রে একটি ‘বড় মোড়’ হিসেবে দেখছেন। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একটি চুক্তি সম্পন্ন হলে ওমান সীমান্ত দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কোনো ধরনের আক্রমণের ঝুঁকি ছাড়াই অবাধে যাতায়াত করতে পারবে। তবে এই সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে ওয়াশিংটনকে ইরানের দেওয়া বেশ কিছু কঠিন দাবি ও শর্ত মেনে নিতে হবে। যদিও শর্তগুলোর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তেহরানের মূল লক্ষ্য।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব ও বর্তমান সংকট
মাত্র ৩৪ কিলোমিটার প্রশস্ত এই প্রণালিটি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন জরুরি পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর প্রধান রুট। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগরের ভেতরে কয়েক শ বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ২০ হাজার নাবিক গত দেড় মাস ধরে আটকা পড়ে আছেন। নজিরবিহীন এই বিপর্যয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।
মধ্যস্থতায় পাকিস্তান: তেহরানে আসিম মুনির
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। শান্তি আলোচনার অংশ হিসেবে বুধবার মার্কিন প্রশাসনের বিশেষ বার্তা নিয়ে তেহরান পৌঁছান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি। বিমানবন্দরে তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। এরপরই শুরু হয় রুদ্ধদ্বার বৈঠক। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতা সফল হলে হরমুজ প্রণালির দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব।
অস্পষ্টতা ও পশ্চিমা মহলের প্রতিক্রিয়া
তেহরানের এই প্রস্তাব নিয়ে আশার আলো দেখা দিলেও কিছু বিষয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। পশ্চিমা নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরান সেখানে পেতে রাখা মাইনগুলো সরিয়ে নেবে কি না অথবা ইসরায়েলের সাথে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকেও একই সুবিধা দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে ইরান এখনো স্পষ্ট কিছু বলেনি। লন্ডন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সভায় সদস্য দেশগুলো ইতিপূর্বে ইরানের শুল্ক আরোপের চেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করেছিল। ওয়াশিংটন এখনো এই প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব দেয়নি, তবে হোয়াইট হাউস বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
'বিডি নিউজ সত্যকথা' বিশ্লেষণ: নতি স্বীকার না কি কৌশল?
ইরানের এই নতুন প্রস্তাবের পেছনে কয়েকটি গভীর সমীকরণ কাজ করছে বলে মনে করে বিডি নিউজ সত্যকথা-এর বিশ্লেষক দল:
১. অর্থনৈতিক টিকে থাকার লড়াই: গত সোমবার থেকে ইরানের তেলবাহী জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবরোধ কার্যকর হয়েছে। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ধস নামা ঠেকাতে ইরান এখন একটি ‘সম্মানজনক প্রস্থান’ বা এক্সিট রুট খুঁজছে। হরমুজ প্রণালিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা মূলত অবরোধ শিথিল করতে চায়।
২. ট্রাম্পের ‘ওয়ার এন্ডিং’ সিগন্যাল: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি যুদ্ধ শেষ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই অবস্থানের সুযোগ নিয়ে ইরান নিজেদের দাবিগুলো আদায় করে নিতে চাইছে। ওমান সীমান্ত দিয়ে জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়া মূলত একটি ‘গুডউইল জেসচার’ বা শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে কাজ করতে পারে।
৩. আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো: ১৯৬৮ সালের ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম অনুযায়ী ওমান ও ইরানের জলসীমা আলাদা। ইরান ওমান অংশ দিয়ে জাহাজ চলাচলে ছাড় দেওয়ার কথা বলে মূলত নিজেদের জলসীমার ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব ধরে রাখার কৌশল নিয়েছে।
৪. ইসরায়েল ফ্যাক্টর: ইরান এখনো ইসরায়েলি জাহাজ চলাচলের বিষয়ে নীরব। এর অর্থ হলো, তারা আলোচনার টেবিলে চূড়ান্ত মুহূর্ত পর্যন্ত কিছু তাসের কার্ড হাতে রাখতে চায়। যদি ইসরায়েলি জাহাজকে সুবিধা না দেওয়া হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় থেকে যাচ্ছে।
বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হরমুজ প্রণালির বিকল্প নেই। গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগেই যদি এই প্রস্তাব কার্যকর হয়, তবেই কেবল বিশ্ব বড় ধরনের মন্দা থেকে রক্ষা পেতে পারে। এখন সবার নজর ওয়াশিংটনের জবাব এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতার চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে।
আরও পড়ুন: হোয়াটসঅ্যাপে আর লাগবে না ফোন নম্বর: আসছে নতুন ‘ইউজারনেম’ ফিচার
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন