গভীর রাতে অভিযান ও ১১ মামলার পাহাড়
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল বারিধারা ডিওএইচএসের ১৫৩ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালায়। দীর্ঘ সময় বাড়িটি ঘেরাও করে রাখার পর তাকে আটক করে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। মঙ্গলবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পল্টন থানায় দায়ের করা একটি সুনির্দিষ্ট মানব পাচার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
ডিবির তথ্যমতে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টন, বনানী, কোতোয়ালি, মিরপুর ও হাতিরঝিল থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মানব পাচার ও চাঁদাবাজিসহ মোট ১১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ফেনী জেলায় ৬টি এবং ঢাকা মহানগর এলাকায় ৫টি মামলা রয়েছে। ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “তিনি দীর্ঘদিন পলাতক থাকায় আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। আমরা সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করেছি।”
আদালতে নাটকীয়তা ও গণরোষ
মঙ্গলবার বিকেলে কড়া নিরাপত্তায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আদালতে তোলা হয়। শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতকে বলেন, “যাকে এক সময় টর্চার (নির্যাতন) করে হত্যা করতে চেয়েছিলেন এই কর্মকর্তা, তিনিই আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী।” রিমান্ড শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ তার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আদেশ শেষে আদালত থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেখানে উপস্থিত বিক্ষুব্ধ জনতা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে লক্ষ্য করে পচা ডিম ছুড়তে থাকে এবং বিভিন্ন স্লোগান দেয়। জনৈক এক বিক্ষোভকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “১০টি পচা ডিম মেরে একটু শান্তি পেয়েছি, আগামীতে সুযোগ পেলে আরও মারব।”
এক-এগারোর প্রতাপশালী ‘ফিল্ড অপারেটর’
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর পরিচয় শুধু একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা বা এমপি হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পেছনে তাকে অন্যতম ‘কি-প্লেয়ার’ বা কুশীলব মনে করা হয়। তৎকালীন নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে তিনি ‘গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। ওই কমিটির মাধ্যমেই তখন দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার ও যৌথবাহিনীর অভিযান পরিচালিত হতো। অনেক বিশ্লেষক তাকে সেই সময়ের বাস্তবায়নকারী বা “ফিল্ড অপারেটর” হিসেবেও দেখেন।
বিতর্কিত ক্যারিয়ার: সেনানিবাস থেকে সংসদ
২০০৮ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ক্যারিয়ারে নাটকীয় মোড় আসে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের বিচারের দাবি তুললেও রহস্যজনকভাবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করে। এমনকি তিন দফায় তার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। অবসরের পর তিনি একাধিক ব্যবসায় যুক্ত হন এবং ২০১৮ সালে প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইলেও পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ফেনী-৩ আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ডিবির সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, শুধু ফৌজদারি মামলাই নয়, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সিআইডিতে একাধিক অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অন্ধকার অধ্যায়ের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পুনর্মূল্যায়ন। প্রায় দুই দশক পর এক-এগারোর কুশীলবদের বিচারের আওতায় আনা দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার একটি বলিষ্ঠ ইঙ্গিত। যদিও পুলিশ তাকে মানব পাচার ও ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে, কিন্তু জনমনে প্রশ্ন রয়েছে—এটি কি কেবল আইনি পদক্ষেপ নাকি ওয়ান ইলেভেনের সময়কার ভূমিকার জন্য কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সেই সময়ের ক্ষমতার কাঠামোর অত্যন্ত প্রভাবশালী অংশ ছিলেন। এতদিন তিনি বিভিন্ন সরকারের আনুকূল্য পেলেও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার এই পতন ক্ষমতার চিরস্থায়ী না হওয়ারই প্রমাণ। তবে এই বিচার প্রক্রিয়া যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হয় এবং কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে থেকে প্রকৃত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা হয়, সেটাই সচেতন নগরবাসীর প্রত্যাশা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন